উত্তর ভারতের সমভূমি অঞ্চল আলোচনা কর। //The Northern Great Plains // মাধ্যমিক ভূগোল // ২০২৪ সাজেশন // madhyamick important question
ভারতবর্ষের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক যুগে গঠিত হওয়ায় এদেশের ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ। এই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য অনুসারে ভারতকে প্রধান পাঁচটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। সেগুলি হল-
১) উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল,
২) উত্তরের সমভূমি অঞ্চল,
৩) উপদ্বীপীয় মালভূমি অঞ্চল,
৪) উপকূলীয় সমভূমি অঞ্চল,
৫) দ্বীপ অঞ্চল।
উত্তর ভারতের সমভূমি অঞ্চল
ধারণাঃ
ভারতের উত্তরে হিমালয় ও দক্ষিণে উপদ্বীপীয় মালভূমির মধ্যবর্তী অংশে সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পলি সঞ্চয়ের ফলে গঠিত হয়েছে ভারতের উত্তরের বৃহৎ সমভূমি অঞ্চল। যা আবার সিন্ধু গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র সমভূমি নামেও পরিচিত।
অবস্থান, আয়তন ও বিস্তারঃ
উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে দক্ষিনে উপদ্বীপীয় মালভূমির উত্তর অংশ, পশ্চিমে পাঞ্জাব থেকে পূর্বে আসাম পর্যন্ত আয়তন প্রায় 7.8 লক্ষ বর্গ কিমি। উত্তরের সমভূমি অঞ্চল পূর্ব পশ্চিমে প্রায় 2500 কিমি ও উত্তর দক্ষিণে প্রায় 80-500 কিমি বিস্তৃত।
পাঞ্জাব হরিয়ানা উত্তর প্রদেশ বিহার পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম রাজ্যের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত।
বৈশিষ্ট্যঃ
১। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম সঞ্চয়জাত সমভূমি (আয়তন 1 লক্ষ বর্গ কিমি.)।
২। এটি ভারতের বিভিন্ন ভূ-প্রকৃতির মধ্যে নবীনতম অংশ।
৩। এটি পূর্ব পশ্চিমে প্রায় 2500 কিমি. এবং উত্তর-দক্ষিণে 80-500 কিমি. বিস্তৃত।
৪। এটি প্রধানত সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং তাদের উপনদী ও শাখানদীর পলি দ্বারা গঠিত।
৫। বারবার দিক পরিবর্তন করে নদীগুলি সমভূমি অঞ্চলে বিভিন্ন জলাভূমি সৃষ্টি করে। এদের কৌর বা তাল বা দহ বা বিল বলে।
ভূপ্রকৃতিঃ
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 300 মিটারের কম উচ্চতা বিশিষ্ট এই বৃহৎ সমভূমি অঞ্চল টি পশ্চিম থেকে পূর্বে ক্রমশ ঢালু হয়ে গেছে।উত্তরের এই সমভূমির ভূপ্রকৃতি একেবারেই সমতল। নদীবাহিত প্রস্তরখন্ড দ্বারা অঞ্চলটি আবৃত। এই অঞ্চল পাঞ্জাবে—ভাবর এবং আসাম ও উত্তরবঙ্গে ডুয়ার্স নামে পরিচিত। ভাবরের দক্ষিণে প্রায় 15 -30 কিমি প্রশস্ত বিস্তীর্ণ জলাভূমি তরাই অঞ্চল নামে পরিচিত।
ভূ প্রকৃতি ও মৃত্তিকার গঠন প্রণালীর উপর ভিত্তি করে ভারতীয় বৃহৎ সমভূমির নিম্নলিখিত ভূমিরূপ গত বৈচিত্র পরিলক্ষিত হয়
১। ভাবর ঃ হিমালয়ের পাদদেশীয় অঞ্চলে নদীবাহিত বালি, নুড়ি, পাথর সঞ্চিত হয়ে যে ঈষৎ ঢেউ খেলানাে ভূমিরূপের সৃষ্টি হয় তাকে ভাবর বলে।শিবালিক হিমালয়ের পাদদেশ বরাবর পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত 8-16 কিলোমিটার চওড়া।
২। তরাই ঃ ভাবর অঞ্চলের দক্ষিণে প্রায় সমান্তরালে অবস্থিত 15 থেকে 30 কিমি প্রশস্থ বিশিষ্ট জলাভূমি ময় অঞ্চলকে তরাই বলে।
৩। ভাঙ্গরঃ নদীর প্লাবনভূমি থেকে উচ্চ অংশে অবস্থিত প্রাচীন পলি দ্বারা গঠিত সমভূমি অঞ্চল গুলি ভাঙ্গর নামে পরিচিত।
৪। খাদারঃ নদীর প্লাবনভূমি অঞ্চলে প্রতি বছর নবীন পলির সঞ্চয়ের ফলে যে নিচু সমতল ভূমির সৃষ্টি হয়েছে, তাকে খাদার বলে।পাঞ্জাবে বেট নামে পরিচিত।
৫। রেহ বা কলারঃ সমভূমি অঞ্চলে কৃষিকাজের জন্য ব্যাপক জলসেচের ফলে অনেক জায়গায় লবণাক্ত মাটির সৃষ্টি হয়। স্থানীয় ভাবে এই মাটি রেহ, কলার, ঊষর নামে পরিচিত।
৬। ভুরঃ ভারতের বৃহৎ সমভূমির কোন কোন অঞ্চলে মাঝে মধ্যে বায়ু বাহিত বালির সঞ্চয়ের ফলে অনুচ্চ টিলার আকারে যে বালিয়াড়ি সৃষ্টি হয়, তাদের ভুর বলে।
আঞ্চলিক শ্রেণীবিভাগ:
ভূ- প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের ভিত্তিতে উত্তরের সমভূমি অঞ্চলকে 4 ভাগে বিভক্ত। যথা
a) সিন্ধু ও শতদ্রু সমভূমি
b) গাঙ্গেয় সমভূমি
c) ব্রহ্মপুত্র সমভূমি
d) রাজস্থানের মরু অঞ্চল।
রাজস্থানের মরু অঞ্চল
অবস্থান: মূলত রাজস্থান এবং গুজরাট, পাঞ্জাব ও হরিয়ানার সামান্য অংশ জুড়ে অবস্থিত। ভারতের এই মরু অঞ্চলের নাম থর। মরুভূমির ¾ অংশ ভারতে এবং ¼ অংশ পাকিস্তানের অন্তর্গত।
ভারতের মরু অঞ্চল উত্তর দক্ষিণে 680 কিমি দীর্ঘ এবং পূর্ব-পশ্চিমে 300 কিমি প্রশস্থ।
আয়তন: মরুভূমির আয়তন 2 লক্ষ 69 হাজার বর্গ কিমি। এখানে যে ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য গুলি দেখা যায় সেগুলি হল বাগর, রোহি, ক্ষুদ্রমরু, হামাদা, মরুস্থলি এছাড়া ধ্রিয়ান, প্লায়া, ধান্দ, রান দেখা যায়।
রাজস্থান সমভূমির বালুকাময় পশ্চিমাংশ টি বাগার নামে পরিচিত। এই সমভূমির পূর্বাংশ টি আরাবল্লি থেকে উৎপন্ন ছোট ছোট নদীর পলি সঞ্চয়ের ফলে উৎপন্ন হওয়ায় খুব উর্বর এবং এই অংশ টির নাম রোহি।
সিন্ধু ও শতদ্রু সমভূমি
অবস্থানঃ সিন্ধু এবং তার উপনদী গুলির সঞ্চয় কার্যের ফলে অঞ্চলটি গঠিত। পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় অবস্থিত বলে এর অপর নাম পাঞ্জাব-হরিয়ানা সমভূমি।
সংজ্ঞাঃ রাজস্থান সমভূমির উত্তর - পূর্ব অংশে অবস্থিত পাঞ্জাব ও হরিয়ানার বিশাল অঞ্চলে শতুদ্রু, ইরাবতী, চন্দ্রভাগা, বিতস্তা ও বিপাশা নদীর পলি সঞ্চয়ের ফলে যে সমভূমির বিকাশ ঘটেছে, তাকে পাঞ্জাব সমভূমি বলে।
বৈশিষ্ট্যঃ
i) নদীর মধ্যবর্তী সমভূমি অঞ্চল দোয়াব।
ii) প্লাবনভূমিগুলি ধায়া এবং
iii) উত্তরের ক্ষয়প্রাপ্ত অংশ খোশ নামে পরিচিত।
iv) গড় উচ্চতা প্রায় 250 মিটার।
পাঞ্জাব সমভূমি অঞ্চলটি মূলত পাঁচ টি নদীর মধ্যবর্তী দোয়াব অঞ্চলের মিলিত রূপ। পূর্ব থেকে পশ্চিমে এই দোয়াব গুলি হল -
i. বিপাশা ও শতদ্রু নদীর মধ্যবর্তী বিস্ত জলন্ধর দোয়াব
ii. বিপাশা ও ইরাবতী নদীর মধ্যবর্তী বারি দোয়াব
iii. ইরাবতী ও চন্দ্রভাগা নদীর মধ্যবর্তী রেচনা দোয়াব
iv. চন্দ্রভাগা ও বিতস্তা নদীর মধ্যবর্তী চাজ দোয়াব
v. বিতস্তা ও সিন্ধু নদীর মধ্যবর্তী সিন্ধ সাগর দোয়াব
গঙ্গা সমভূমিঃ
দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের প্রায় 3•75 লক্ষ বর্গ কিমি স্থান জুড়ে অবস্থান করছে গঙ্গা সমভূমি। এই সমভূমিকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা হয় -
(1) উচ্চ-গঙ্গা সমভূমি:- গঙ্গা সমভূমির উত্তরপ্রদেশের অংশ উচ্চ-গঙ্গা সমভূমি নামে পরিচিত। এর গড় উচ্চতা 100-300 মিটার। এই অঞ্চলের প্রাচীন পলি সমৃদ্ধ অঞ্চল 'ভাঙ্গার' নামে ও নবীন পলি গঠিত অঞ্চল 'খাদার' নামে পরিচিত। উচ্চ গঙ্গা সমভূমির পর্বতের পাদদেশের অঞ্চলকে 'ভাবর' এবং তার দক্ষিণের অংশকে 'তরাই' বলে।
(2) মধ্য-গঙ্গা সমভূমি:- উত্তরপ্রদেশের পূর্বাংশে এবং বিহারের উত্তরাংশের সমভূমি মধ্য গঙ্গা সমভূমি নামে পরিচিত। এর গড় উচ্চতা 50-100 মিটার। 100 মিটার সম্পন্ন রেখা উচ্চ ও মধ্য গঙ্গা সমভূমির সীমানা নির্দেশ করে। এখানেও খাদার ও ভাঙ্গাড় দেখা যায়।
(3) নিম্ন-গঙ্গা সমভূমি:- দার্জিলিং ও পুরুলিয়া বাদে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ নিম্ন গঙ্গা সমভূমির অন্তর্গত। গড় উচ্চতা 50 মিটারেরও কম।
নিম্ন গঙ্গা সমভূমির একটা বড় অঞ্চল পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপের অংশ।
এখানকার ভূ- প্রাকৃতিক অংশগুলি হল-
তরাই ও ডুয়ার্স
উত্তরবঙ্গ সমভূমি
রাঢ় সমভূমি
ব-দ্বীপ অঞ্চল
ব্রহ্মপুত্র সমভূমিঃ
ব্রহ্মপুত্র ও তার উপ নদীবাহিত পলি সঞ্চয়ের ফলে এই সমভূমি গঠিত হয়েছে বলে কে ব্রহ্মপুত্র সমভূমি বা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা বলা হয়। আবার এই সমভূমির বেশিরভাগ অংশ আসামে রয়েছে বলে একে আসাম সমভূমি ও বলা হয়। এই সমভূমির তিনদিক বিভিন্ন উচ্চতার পর্বত দ্বারা বেষ্টিত। ব্রহ্মপুত্র সমভূমির আয়তন প্রায় 56 হাজার বর্গ কিমি।




0 Comments