"দুর্যোগ ও বিপর্যয়" (Hazards and Disasters).// WBSSE// CLASS 9
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর ভূগোলের অষ্টম অধ্যায় "দুর্যোগ ও বিপর্যয়" (Hazards and Disasters)-এর একটি সম্পূর্ণ এবং সহজ আলোচনা নিচে দেওয়া হলো।
১. দুর্যোগ ও বিপর্যয়: ধারণা (Concept)
দুর্যোগ (Hazard)
দুর্যোগ হলো প্রকৃতির এমন এক অস্বাভাবিক অবস্থা বা ঘটনা, যা মানুষের জীবন, সম্পত্তি বা পরিবেশের ক্ষতি করার সম্ভাবনা তৈরি করে। এটি একটি আশঙ্কা বা প্রাথমিক পর্যায়। যেমন: হঠাৎ মেঘ ভাঙা বৃষ্টি বা তীব্র খরা।
বিপর্যয় (Disaster)
দুর্যোগ যখন মারাত্মক রূপ ধারণ করে ব্যাপক জনজীবনহানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন করে, তখন তাকে বিপর্যয় বলে। দুর্যোগের চূড়ান্ত ও বিধ্বংসী রূপই হলো বিপর্যয়। যেমন: ওই মেঘ ভাঙা বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট হড়পা বান বা বন্যা যখন কোনো গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
২. দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের মধ্যে পার্থক্য (Difference between Hazard and Disaster)
দুর্যোগ এবং বিপর্যয় এক মনে হলেও এদের মধ্যে সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে:
| বৈশিষ্ট্য | দুর্যোগ (Hazard) | বিপর্যয় (Disaster) |
| সংজ্ঞা | এটি একটি ক্ষতিকারক প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট ঘটনা বা সম্ভাবনা। | দুর্যোগের তীব্র রূপ যা ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পত্তি ধ্বংস করে। |
| ব্যাপ্তি ও ক্ষয়ক্ষতি | এর ক্ষয়ক্ষতি সীমিত বা স্থানীয় স্তরে থাকে। | এর ক্ষয়ক্ষতি অত্যন্ত ব্যাপক এবং তা সামলাতে বাইরের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। |
| সময় | এটি বিপর্যয়ের পূর্ববর্তী অবস্থা (গাছের কুঁড়ির মতো)। | এটি দুর্যোগের পরবর্তী চূড়ান্ত রূপ (ফুল ফোটার মতো)। |
| উদাহরণ | মাঝসমুদ্রে সৃষ্ট শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। | সেই ঘূর্ণিঝড় যখন স্থলভাগে আছড়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে। |
৩. দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের শ্রেণীবিভাগ (Classification)
উৎপত্তি ও কারণ অনুসারে দুর্যোগ ও বিপর্যয়কে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
[দুর্যোগ ও বিপর্যয়]
|
-------------------------------------------------
| | |
[প্রাকৃতিক (Natural)] [আধা-প্রাকৃতিক (Semi-natural)] [মানবজাত (Man-made)]
(যেমন: ভূমিকম্প) (যেমন: ধস, বন্যা) (যেমন: যুদ্ধ, গ্যাস দুর্ঘটনা)
৪. ভূতাত্ত্বিক দুর্যোগ ও এর প্রকারভেদ (Geological Hazard and its Types)
পৃথিবীর অভ্যন্তরে বা ভূত্বকের পরিবর্তনের ফলে যে সমস্ত দুর্যোগ ঘটে, তাদের ভূতাত্ত্বিক দুর্যোগ বলে। এর প্রধান প্রকারভেদগুলি নিচে দেওয়া হলো:
ক) ভূমিকম্প (Earthquake)
কারণ: টেকটনিক পাতের (Tectonic Plates) সঞ্চালনের ফলে ভূগর্ভে হঠাৎ কম্পন সৃষ্টি হয়।
সাম্প্রতিক উদাহরণ: ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তুরস্ক ও সিরিয়ায় বিধ্বংসী ভূমিকম্প।
খ) আগ্নেয়োচ্ছ্বাস (Volcanic Eruption)
কারণ: ভূগর্ভের ম্যাগমা বা গলিত লাভা যখন প্রবল চাপে ভূত্বকের কোনো ফাটল দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।
সাম্প্রতিক উদাহরণ: ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে প্রশান্ত মহাসাগরের 'হুঙ্গা টোঙ্গা-হুঙ্গা হাপাই' (Hunga Tonga-Hunga Ha'apai) সাবমেরিন আগ্নেয়গিরির মহাবিস্ফোরণ।
গ) সুনামি (Tsunami)
কারণ: সমুদ্রবক্ষে তীব্র ভূমিকম্প বা আগ্নেয়োচ্ছ্বাসের ফলে সৃষ্ট বিশাল আকৃতির সামুদ্রিক ঢেউ।
উদাহরণ: ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরের সুনামি (ভারতসহ একাধিক দেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল)।
ঘ) ভূমিধস (Landslide)
কারণ: পাহাড়ের ঢালে থাকা মাটি বা শিলাস্তর যখন মাধ্যাকর্ষণ টানে হঠাৎ নিচে ধসে পড়ে। (এটি অনেক সময় আধা-প্রাকৃতিকও হয়)।
সাম্প্রতিক উদাহরণ: ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কেরালার ওয়েনাড় (Wayanad)-এ ভয়াবহ ভূমিধস।
৫. আবহাওয়াগত দুর্যোগ ও এর প্রকারভেদ (Meteorological Hazard and its Types)
বায়ুমণ্ডলের উপাদানগুলির (উষ্ণতা, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ) আকস্মিক ও চরম পরিবর্তনের ফলে যে দুর্যোগ সৃষ্টি হয়, তাকে আবহাওয়াগত দুর্যোগ বলে। নিচে এর বিস্তারিত আলোচনা দেওয়া হলো:
ক) ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় (Tropical Cyclone)
বিস্তারিত: ক্রান্তীয় অঞ্চলের উষ্ণ সমুদ্রে গভীর নিম্নচাপ সৃষ্টির ফলে তীব্র গতিসম্পন্ন কুন্ডলীপাকানো বায়ুর আবির্ভাব ঘটে, যা স্থলভাগে আছড়ে পড়ে ব্যাপক তান্ডব চালায়।
সাম্প্রতিক উদাহরণ: ২০২৪ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় 'রেমাল' (Remal)।
খ) বন্যা (Flood)
বিস্তারিত: অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, নদীর বাঁধ ভাঙা বা মেঘ ভাঙা বৃষ্টির (Cloudburst) কারণে যখন বিস্তীর্ণ স্থলভাগ দীর্ঘ সময় ধরে জলের নিচে ডুবে থাকে।
সাম্প্রতিক উদাহরণ: ২০২৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ত্রিপুরার বন্যা এবং ২০২৫-২৬ সালেও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা।
গ) খরা (Drought)
বিস্তারিত: কোনো অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে (কয়েক মাস বা বছর) স্বাভাবিকের তুলনায় অত্যন্ত কম বৃষ্টিপাত হলে মাটির আর্দ্রতা শেষ হয়ে জলকষ্ট দেখা দেয় এবং চাষবাস ব্যাহত হয়।
সাম্প্রতিক উদাহরণ: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকার 'হর্ন অফ আফ্রিকা' (Horn of Africa) অঞ্চলে এবং ভারতের বুন্দেলখন্ড অঞ্চলে তীব্র খরা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
ঘ) তাপপ্রবাহ ও শৈত্যপ্রবাহ (Heatwave and Coldwave)
বিস্তারিত: গ্রীষ্মকালে স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে গেলে (যেমন সমতলে ৪০° সেলসিয়াসের বেশি) তাকে তাপপ্রবাহ বলে। আবার শীতকালে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা নেমে গেলে তাকে শৈত্যপ্রবাহ বলে।
সাম্প্রতিক উদাহরণ: ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের এপ্রিল-মে মাসে ভারতের গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর ভারতে রেকর্ড সৃষ্টিকারী তীব্র তাপপ্রবাহ (Heatwave)।
ঙ) মেঘ ভাঙা বৃষ্টি ও হড়পা বান (Cloudburst and Flash Flood)
বিস্তারিত: অত্যন্ত অল্প সময়ে (সাধারণত ১ ঘন্টায় ১০০ মিমি বা তার বেশি) কোনো সীমিত এলাকায় মুষলধারে বৃষ্টি হলে তাকে মেঘ ভাঙা বৃষ্টি বলে। এর ফলে পাহাড়ি নদীতে যে হঠাৎ তীব্র জলস্ফীতি ঘটে, তাকে হড়পা বান বলে।
সাম্প্রতিক উদাহরণ: ভারতের উত্তরাখণ্ড এবং হিমাচল প্রদেশে বর্ষাকালে নিয়মিত এই ধরনের দুর্যোগ দেখা যায়।


0 Comments