গ্রহরূপে পৃথিবী (Earth as a Planet)// WBSLST // CLASS 9 //WBBSE
অধ্যায় ১: গ্রহরূপে পৃথিবী (Earth as a Planet)
১. সৌরজগতে পৃথিবীর অবস্থান ও সাধারণ পরিচয়
মহাজাগতিক বস্তু: আকাশগঙ্গা ছায়াপথের অন্তর্গত সূর্য একটি নক্ষত্র যার বয়স প্রায় ৫০০ কোটি বছর। সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান ৮টি প্রধান গ্রহ, ৫টি বামন গ্রহ এবং অসংখ্য উপগ্রহ নিয়ে সৌরজগৎ বা সৌরপরিবার গঠিত।
বামন গ্রহ (Dwarf Planets): সৌরজগতে বর্তমানে ৫টি স্বীকৃত বামন গ্রহ আছে— প্লুটো, সেরেস, এরিস, হাউমেয়া এবং মাকিমাকি।
দূরত্ব অনুসারে স্থান: সূর্য থেকে দূরত্বের ক্রমানুসারে পৃথিবী তৃতীয় গ্রহ (বুধ ও শুক্রের পর)।
গড় দূরত্ব ও আলোর গতি: সূর্য থেকে পৃথিবীর গড় দূরত্ব প্রায় ১৫ কোটি কিমি (১৪ কোটি ৯৬ লক্ষ কিমি)। সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে প্রায় ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড (বা প্রায় ৮ মিনিট)।
আকার অনুসারে স্থান: আয়তনের দিক থেকে পৃথিবী সৌরজগতের পঞ্চম বৃহত্তম গ্রহ (বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুনের পর)।
প্রাণের বিকাশ: পৃথিবী সৃষ্টির বয়স প্রায় ৪৫০ কোটি বছর। সৃষ্টির প্রায় ২৫০ কোটি বছর পর পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাব ঘটে এবং মানুষের উৎপত্তি হয়েছে মাত্র ৩০ লক্ষ বছর আগে।
২. পৃথিবীর আকৃতি সংক্রান্ত প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ধারণা
প্রাচীনকালে পৃথিবীর আকৃতি নিয়ে বিভিন্ন রকমের কাল্পনিক ও অসম্পূর্ণ ধারণা ছিল:
চ্যাপ্টা বা সমতল ধারণা: প্রাচীন মিশরীয়, ব্যাবিলনীয় ও ফিনিশীয় নাবিকরা মনে করতেন পৃথিবী একটি চ্যাপ্টা থালার মতো যার চারদিকে জলভাগ বা মহাসাগর রয়েছে।
গ্রিক ও ভারতীয় পণ্ডিতদের মতবাদ (গোলাকার ধারণা):
পাইথাগোরাস: খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দে তিনিই প্রথম ঘোষণা করেন যে পৃথিবী মোটেও চ্যাপ্টা নয়, এটি গোলাকার।
এরাটোসথেনিস: বিখ্যাত গ্রিক জ্যোতির্বিদ যিনি প্রথম বৈজ্ঞানিক উপায়ে পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় করেছিলেন (প্রায় ৩৯,৩৫০ কিমি)।
আর্যভট্ট ও বরাহমিহির: প্রাচীন ভারতীয় এই জ্যোতির্বিদ্বয় প্রাচীনকালেই পৃথিবীর গোলাকার আকৃতির কথা প্রমাণ করেছিলেন। আর্যভট্ট পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় করেছিলেন প্রায় ৩,৯২৭ যোজন।
ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান: ১৫১৯-১৫২২ সালের মধ্যে পর্তুগিজ পরিব্রাজক ম্যাগেলানের জাহাজ সমগ্র পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে প্রমাণ করে যে পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার।
৩. পৃথিবী গোলাকার হওয়ার পক্ষে প্রধান প্রমাণসমূহ (Direct & Indirect Proofs)
১. চন্দ্রগ্রহণের সময় পৃথিবীর ছায়া: চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের ওপর পৃথিবীর যে ছায়া পড়ে তা সর্বদা বৃত্তাকার বা গোলাকার হয়। একমাত্র গোলাকার বস্তুর ছায়াই সর্বদা বৃত্তাকার হতে পারে (প্রথম পর্যবেক্ষণ করেন অ্যারিস্টটল)।
২. জাহাজের দৃশ্যমানতা: সমুদ্রের দূর দিগন্ত থেকে কোনো জাহাজ যখন তীরের দিকে আসে, তখন প্রথমে তার মাস্তুল, তারপর ডেক এবং শেষে সম্পূর্ণ জাহাজটি দেখা যায়। পৃথিবী সমতল হলে একসাথেই পুরো জাহাজ দেখা যেত।
৩. বেডফোর্ড লেভেল পরীক্ষা (Bedford Level Experiment): ১৮৭০ সালে এ. আর. ওয়ালেস ইংল্যান্ডের বেডফোর্ড খালে ১ কিমি অন্তর ৩টি সমান দৈর্ঘ্যের খুঁটি একই সরলরেখায় জলের ওপর ভাসিয়ে দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখেন যে, মাঝের খুঁটিটি দুপাশের খুঁটির তুলনায় কিছুটা উঁচুতে অবস্থান করছে। এটি পৃথিবীর বক্রতার প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
৪. সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত: পৃথিবী গোলাকার বলেই পূর্বের দেশগুলিতে আগে এবং পশ্চিমের দেশগুলিতে পরে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হয়। পৃথিবী সমতল হলে সর্বত্র একই সময়ে দিন ও রাত হতো।
৫. ধ্রুবতারা ও সানরাইজ কোণ: উত্তর গোলার্ধে যত উত্তর দিকে (মেরুর দিকে) যাওয়া যায়, ধ্রুবতারাকে (Pole Star) আকাশের তত উঁচুতে (মাথার ওপর ৯০° কোণে) দেখা যায়। নিরক্ষরেখায় এর মান ০°।
৬. দিগন্ত রেখা (Horizon): কোনো ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ালে মনে হয় আকাশ ও ভূমি একটি বৃত্তাকারে মিশেছে। কোনো উঁচু স্থানে উঠলে এই দিগন্ত রেখার পরিধি আরও বৃদ্ধি পায় এবং তা আরও বৃত্তাকার দেখায়।
৭. মহাকাশ থেকে তোলা ছবি: আধুনিক যুগে কৃত্রিম উপগ্রহ এবং অ্যাপোলো মহাকাশচারীদের (নীল আর্মস্ট্রং, এডউইন অলড্রিন) পাঠানো রঙিন আলোকচিত্রে পৃথিবীকে একটি উজ্জ্বল নীল গোলকের মতো দেখায়।
৪. অভিগত গোলকরূপে পৃথিবী (Earth as an Oblate Spheroid)
যদিও পৃথিবীকে বাইরে থেকে গোল মনে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পৃথিবী সম্পূর্ণ নিখুঁত গোল নয়। নিজের অক্ষের চারদিকে অত্যন্ত দ্রুত বেগে আবর্তনের ফলে সৃষ্ট কেন্দ্রাতিগ বলের (Centrifugal Force) কারণে এর মেরু অঞ্চল সামান্য চাপা এবং নিরক্ষীয় অঞ্চল কিছুটা স্ফীত। এই বিশেষ আকৃতিকে অভিগত গোলক (Oblate Spheroid) বলা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপ (পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি):
নিরক্ষীয় ব্যাস (Equatorial Diameter): ১২,৭৫৭ কিমি (প্রকৃতপক্ষে ১২,৭৫৬.২৭ কিমি)
মেরু ব্যাস (Polar Diameter): ১২,৭১৪ কিমি
ব্যাসের পার্থক্য: নিরক্ষীয় ব্যাস মেরু ব্যাসের তুলনায় ৪৩ কিমি বেশি (১২,৭৫৭ - ১২,৭১৪ = ৪৩ কিমি)।
নিরক্ষীয় পরিধি: প্রায় ৪০,০৭৫ কিমি।
মেরু পরিধি: প্রায় ৩৯,৯৪২ কিমি।
পরিধির পার্থক্য: নিরক্ষীয় পরিধি মেরু পরিধির চেয়ে প্রায় ১৩৩ কিমি বেশি।
বিশেষ দ্রষ্টব্য (নীল গ্রহ বা Blue Planet):
মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে উজ্জ্বল নীল রঙের দেখায়। কারণ পৃথিবীর মোট উপরিভাগের প্রায় ৭০ শতাংশই জলভাগ (সমুদ্র)। এই বিপুল জলরাশির ওপর সূর্যের আলো প্রতিফলিত হওয়ার কারণেই মহাকাশচারীরা একে "নীল গ্রহ" নাম দিয়েছেন।
পৃথিবীর অভিগত গোলকত্বের প্রমাণসমূহ
পৃথিবী যে একটি নিখুঁত গোলক নয়, বরং একটি অভিগত গোলক—তার সপক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
জঁ রিশারের পেন্ডুলাম পরীক্ষা (১৬৭২ খ্রিস্টাব্দ):
ফরাসি জ্যোতির্বিদ জঁ রিশার লক্ষ্য করেন, নিরক্ষীয় অঞ্চলে অবস্থিত কয়েন দ্বীপে (০^\circ) একটি ঘড়ির দোলক (Pendulum) মেরু অঞ্চলের নিকটবর্তী প্যারিস (৪৯^\circ উত্তর) শহরের তুলনায় প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ২ মিনিট ২৮ সেকেন্ড ধীর গতিতে চলে।
কারণ: নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রানুসারে, কোনো বস্তু পৃথিবীর কেন্দ্রের যত কাছে থাকবে, তার ওপর মহাকর্ষীয় টান বা অভিকর্ষজ ত্বরণ (g) তত বেশি হবে। নিরক্ষীয় অঞ্চল কেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে অভিকর্ষজ টান কম এবং দোলকের গতিও শ্লথ হয়। এর থেকে প্রমাণিত হয়— মেরু অঞ্চল চাপা ও নিরক্ষীয় অঞ্চল স্ফীত।
বস্তুর ওজন পরীক্ষা: অভিকর্ষজ টানের পার্থক্যের জন্য একই বস্তুর ওজন নিরক্ষীয় অঞ্চলের তুলনায় মেরু অঞ্চলে কিছুটা বেশি হয়।
অক্ষাংশের রৈখিক মানের পার্থক্য: নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে প্রতি ১^\circ অক্ষাংশের রৈখিক দূরত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। নিরক্ষরেখার কাছে ১^\circ অক্ষাংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ১১১ কিমি (বা ৬৯ মাইল), কিন্তু মেরু অঞ্চলের কাছে তা কিছুটা বেশি। এর থেকে প্রমাণিত হয় মেরু অঞ্চল তুলনামূলকভাবে বেশি সমতল বা চাপা।
ফরাসি ‘রয়্যাল একাডেমি অফ সায়েন্স’-এর পরীক্ষা (১৭৩৫-৩৭): কিতো (০^\circ), প্যারিস (৪৮^\circ উত্তর) ও ল্যাপল্যান্ড (৬৬^\circ উত্তর) অঞ্চলে পরিধি চাপের দৈর্ঘ্য পরিমাপ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেন যে মেরু অঞ্চল সামান্য চাপা।
২. পৃথিবীর আকৃতি নিখুঁত গোল না হওয়ার কারণ
কেন্দ্রাতিগ বল (Centrifugal Force): পৃথিবী তরল ও নমনীয় অবস্থা থেকে কোটি কোটি বছর ধরে নিজের অক্ষের চারদিকে অত্যন্ত দ্রুত বেগে আবর্তন (Rotation) করে চলেছে। এই আবর্তনের ফলে একটি কেন্দ্রবিমুখী বা কেন্দ্রাতিগ বলের সৃষ্টি হয়, যা নিরক্ষীয় অঞ্চলের পদার্থগুলোকে বাইরের দিকে ঠেলে দেয়। ফলে নিরক্ষীয় অঞ্চল স্ফীত এবং মেরু অঞ্চল সামান্য চাপা হয়ে অভিগত গোলকের আকার ধারণ করেছে।
৩. জিওড এবং পৃথিবীর প্রকৃত আকৃতি (Geoid and Earth's Shape)
পৃথিবীর আকৃতি পৃথিবীর মতোই (Earth is Geoid): যদিও পৃথিবীকে 'অভিগত গোলক' বলা হয়, কিন্তু পৃথিবীর উপরিভাগ সম্পূর্ণ মসৃণ নয়। এখানে যেমন রয়েছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৮ মিটার), তেমনই রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতম খাত মারিয়ানা খাত (১১,০২২ মিটার/১১,০৩৪ মিটার)। এদের মধ্যে উচ্চতার তফাত প্রায় ২০ কিমি।
জিওড (Geoid)-এর সংজ্ঞা: গ্রিক শব্দ Geo (পৃথিবী) এবং Eidos (সদৃশ) থেকে ইংরেজি Geoid শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ "পৃথিবীর মতো দেখতে" বা "পৃথিবী সদৃশ"। সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতাকে ধরে পাহাড়-পর্বত ও খাত বর্জিত পৃথিবীর যে গাণিতিক ও কাল্পনিক অবয়ব পাওয়া যায়, তাকেই জিওড বলে।
৪. সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের সাথে পৃথিবীর তুলনা
আকার ও বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সৌরজগতের গ্রহগুলোকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
বৈশিষ্ট্য
- অন্তস্থ গ্রহ (Terrestrial Planets)
- বহিঃস্থ গ্রহ (Jovian/Giant Planets)
গ্রহসমূহের নাম
বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন
অবস্থান ও দূরত্ব
- সূর্যের কাছাকাছি অবস্থিত
- সূর্য থেকে অনেক দূরে অবস্থিত
- আকার ও আয়তন
- এদের আকার ও আয়তন তুলনামূলক ছোট
- এরা আকারে অত্যন্ত বিশাল এবং বৃহৎ
আবর্তন বেগ
- এদের অক্ষীয় আবর্তনের বেগ কম
- এদের অক্ষীয় আবর্তনের বেগ অনেক বেশি
- ঘনত্ব ও উপাদান
- ঘনত্ব বেশি (প্রধানত শিলা ও ধাতু দ্বারা গঠিত)
- ঘনত্ব কম (প্রধানত হালকা গ্যাস ও বরফ দ্বারা গঠিত)
উপগ্রহ সংখ্যা
- উপগ্রহের সংখ্যা নেই বললেই চলে বা খুব কম
- এদের উপগ্রহের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি
সৌরজগতের প্রধান ৮টি গ্রহের তুলনামূলক তথ্য তালিকা:
বৃহত্তম ও ক্ষুদ্রতম: সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতি (পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ১,৩১৭ গুণ বড়) এবং ক্ষুদ্রতম গ্রহ বুধ।
শুক্র গ্রহ: এর অক্ষীয় আবর্তন দিক অন্য গ্রহের বিপরীত (পূর্ব থেকে পশ্চিমে) এবং এর বায়ুমণ্ডলে প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড থাকায় এটি সৌরজগতের উষ্ণতম গ্রহ (৪৮২^\circ\text{C})।
কুইপার বেল্ট ও ওওর্ট ক্লাউড: সৌরজগতের একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত হিমশীতল অঞ্চলকে কুইপার বেল্ট (Kuiper Belt) এবং তারও বাইরে ধূমকেতুর উৎস অঞ্চলকে ওওর্ট ক্লাউড (Oort Cloud) বলে।
৫. মানুষের আবাসস্থল রূপে পৃথিবীর স্বকীয়তা
সৌরজগতের একমাত্র পৃথিবীতেই প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
সূর্য থেকে আদর্শ দূরত্ব: পৃথিবী এমন এক দূরত্বে অবস্থিত (১৫ কোটি কিমি) যার ফলে এখানকার গড় উষ্ণতা ১৭^\circ\text{C} (বা ১৫^\circ\text{C}), যা জীবকুলের বেঁচে থাকার জন্য আদর্শ।
বায়ুমণ্ডলের উপস্থিতি: পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তর (O_3) ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে। এছাড়া প্রাণধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন (O_2), কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO_2) এবং নাইট্রোজেন (N_2) সঠিক অনুপাতে রয়েছে।
বারিমণ্ডল (Hydrosphere):
পৃথিবীর উপরিভাগের প্রায় ৭০.৮% অংশ জলভাগ দ্বারা আবৃত। এই বিপুল জলরাশির উপস্থিতির জন্যই পৃথিবীকে মহাকাশ থেকে নীল দেখায়, তাই একে নীল গ্রহ (Blue Planet) বলা হয়।
শিলামণ্ডল ও মৃত্তিকা: পৃথিবীতে উদ্ভিদের পুষ্টি ও খাদ্য উৎপাদনের জন্য অনুকূল শিলামণ্ডল ও উর্বর মৃত্তিকা স্তর রয়েছে।
চৌম্বক ক্ষেত্র: পৃথিবীর শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র (ভ্যান অ্যালেন বিকিরণ বলয়) মহাজাগতিক ক্ষতিকর কণা থেকে জীবমণ্ডলকে রক্ষা করে।
৬. পৃথিবীর পরিধি, ক্ষেত্রফল ও আয়তন পরিমাপ
পরীক্ষায় গাণিতিক তথ্য ও সূত্র থেকে প্রায়ই প্রশ্ন আসে, এগুলো ভালোভাবে মনে রাখতে হবে:
A. পৃথিবীর পরিধি পরিমাপ (Circumference):
এরাটোসথেনিসের পদ্ধতি: খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২০০ অব্দে গ্রিক পণ্ডিত এরাটোসথেনিস জ্যামিতিক পদ্ধতিতে মিশরের সাইয়েন (Syene) এবং আলেকজান্দ্রিয়া (Alexandria) শহরের ওপর সূর্যের পতন কোণের পার্থক্য (৭^\circ১২') হিসাব করে প্রথম পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় করেন। তাঁর মতে পরিধি ছিল প্রায় ২,৫০,০০০ স্টেডিয়া (প্রায় ৪৬,২২০ কিমি)।
আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরিমাপ: আধুনিক গণনার সূত্রানুসারে, পৃথিবীর পরিধি (২\pi r) প্রায় ৪০,০০০ কিমি। (নির্দিষ্টভাবে নিরক্ষীয় পরিধি ৪০,০৭৫ কিমি)।
B. পৃথিবীর ক্ষেত্রফল পরিমাপ (Surface Area):
গোলকের উপরিভাগের ক্ষেত্রফলের সূত্র = ৪\pi r^২
এই সূত্র অনুযায়ী পৃথিবীর মোট ক্ষেত্রফল প্রায় ৫১ কোটি বর্গ কিমি (বা ৫০ কোটি ৯৮ লক্ষ বর্গ কিমি)।
C. পৃথিবীর আয়তন পরিমাপ (Volume):
গোলকের আয়তনের সূত্র = \frac{৪}{৩}\pi r^৩
এই সূত্র অনুযায়ী পৃথিবীর মোট আয়তন প্রায় ১ লক্ষ ৮ হাজার ৪৫০ কোটি ঘন কিমি (১,০৮৩,৪৫০,০২০,০০০ ঘন কিমি)।
১. পৃথিবীর ওজন পরিমাপ
বিজ্ঞানী হেনরি ক্যাভেন্ডিস: ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ বিজ্ঞানী হেনরি ক্যাভেন্ডিস সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পৃথিবীর ওজন পরিমাপ করেন।
পৃথিবীর ওজন: তাঁর গণনা অনুযায়ী পৃথিবীর মোট ওজন প্রায় ৫.৯৭ \times ১০^{২৪} কিলোগ্রাম (বা প্রায় ৬০ কোটি কোটি কোটি কেজি)।
২. ভূ-অবস্থানিক প্রণালী: GPS (Global Positioning System)
মূল ধারণা ও জনক: মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের উদ্যোগে ডক্টর ব্র্যাডফোর্ড পার্কিনসন (যাকে GPS-এর জনক বলা হয়), রজার এল. এস্টন এবং ইভান এ. গেটিং—এই তিন বিজ্ঞানী ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে জিপিএস ব্যবস্থার সূচনা করেন। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে এটি সম্পূর্ণভাবে কার্যোপযোগী হয়।
সংজ্ঞা: জিপিএস (GPS) হলো সম্পূর্ণ কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক এক অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, যার সাহায্যে যেকোনো আবহাওয়ায় পৃথিবীর যেকোনো স্থানের নিখুঁত অবস্থান জানা যায়।
শনাক্তকরণ উপাদান: জিপিএস মূলত ৪টি উপাদান নির্ণয় করে— অক্ষাংশ (Latitude), দ্রাঘিমাংশ (Longitude), উচ্চতা (Altitude) এবং সময় (Time)।
জিপিএস ব্যবস্থার প্রধান তিনটি বিভাগ (Segments):
১. মহাকাশীয় বিভাগ (Space Segment): ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০,০০০ কিমি উঁচুতে নির্দিষ্ট কক্ষপথে মোট ২৪টি প্রধান কৃত্রিম উপগ্রহ (এবং কয়েকটি অতিরিক্ত ব্যাকআপ উপগ্রহ) ২৪ ঘণ্টায় দুবার করে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। যেকোনো সময়ে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে অন্তত ৪টি উপগ্রহ দৃশ্যমান থাকে।
২. নিয়ন্ত্রণ বিভাগ (Control Segment): উপগ্রহগুলির সঠিক কক্ষপথ পর্যবেক্ষণ, সময় এবং তথ্য সংশোধনের জন্য ভূপৃষ্ঠে একটি 'মাস্টার কন্ট্রোল স্টেশন' এবং বেশ কয়েকটি মনিটরিং স্টেশন কাজ করে।
৩. ব্যবহারকারী বিভাগ (User Segment): আমাদের মোবাইল ফোন, গাড়ি বা জিপিএস রিসিভার যন্ত্র যা উপগ্রহ থেকে পাঠানো রেডিও তরঙ্গ গ্রহণ করে নিখুঁত অবস্থান ও সময় হিসাব করে। এটি গণনার জন্য অত্যন্ত নিখুঁত অ্যাটমিক ক্লক (Atomic Clock) বা পারমাণবিক ঘড়ি ব্যবহার করে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের নিজস্ব অবস্থান নির্ণায়ক ব্যবস্থা:
GLONASS: রাশিয়ার নিজস্ব উপগ্রহভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থা।
GALILEO: ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজস্ব নেভিগেশন ব্যবস্থা।
IRNSS (NavIC): ভারতের নিজস্ব আঞ্চলিক উপগ্রহভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা (Indian Regional Navigation Satellite System)।
জিপিএস (GPS)-এর প্রধান ব্যবহার:
স্থান ও যান চলাচল: স্থলযান, বিমান ও সমুদ্রের জাহাজে সঠিক দিকনির্ণয় এবং ট্র্যাকিং-এর জন্য।
দুর্যোগ ও উদ্ধারকার্য: কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ভূমিকম্প, সুনামি) ঘটলে দ্রুত দুর্ঘটনাস্থল চিহ্নিত করতে।
প্রতিরক্ষা বা সামরিক কাজ: যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুঘাঁটি চিহ্নিত করতে এবং নিখুঁতভাবে ক্ষেপণাস্ত্র বা মিসাইল নিক্ষেপ করতে।
মানচিত্র তৈরি ও সমীক্ষা: নিখুঁত ভূমি জরিপ (Survey) এবং আধুনিক ডিজিটাল মানচিত্র তৈরিতে।
৩. মহাজাগতিক বস্তুসমূহের পরিভাষা ও ধারণা (Glossary)
কুলীন গ্রহ (Major Planets): সৌরজগতের প্রধান ৮টি গ্রহ যাদের আকার বড়, ভর বেশি এবং যারা নিজস্ব কক্ষপথের চারপাশ থেকে অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
বামন গ্রহ (Dwarf Planets): ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন (IAU)-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্লুটোকে গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বামন গ্রহের মর্যাদা দেওয়া হয়। এরা আকারে ছোট এবং এদের কক্ষপথে অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু বা গ্রহাণু পুঞ্জ রয়ে যায় (যেমন— প্লুটো, এরিস, সেরেস, হাউমেয়া, মাকিমাকি)।
ধূমকেতু (Comet): গ্যাস, ধুলো ও বরফ দ্বারা গঠিত ঝাঁটার মতো লেজবিশিষ্ট মহাজাগতিক বস্তু যা সূর্যের কাছাকাছি এলে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে (যেমন— হ্যালির ধূমকেতু, যা প্রতি ৭৬ বছর পর পর দেখা যায়)।
নক্ষত্রমণ্ডল (Constellation): মহাকাশে কাছাকাছি থাকা নক্ষত্রগুলি যখন কাল্পনিক রেখায় যুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট কোনো আকৃতি গঠন করে (যেমন— সপ্তর্ষিমণ্ডল, কালপুরুষ ইত্যাদি)। আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথে এমন প্রায় ৮৮টি নক্ষত্রমণ্ডল রয়েছে।
ছায়াপথ বা গ্যালাক্সি (Galaxy): কোটি কোটি নক্ষত্র, গ্যাস ও ধূলিকণার এক বিশাল ঘূর্ণায়মান সমষ্টি। আমাদের সৌরজগৎ যে ছায়াপথের অন্তর্গত তার নাম আকাশগঙ্গা (Milky Way), যার আকৃতি সর্পিল বা পেঁচানো (Spiral)।



0 Comments