সপ্তম শ্রেণীর ভূগোল (WBBSE)
দ্বিতীয় অধ্যায়: ভূপৃষ্ঠে কোনো স্থানের অবস্থান নির্ণয়
এই অধ্যায়ে পৃথিবীর যে কোনো স্থানের সঠিক অবস্থান (Location) কীভাবে নির্ণয় করা হয়, তা আলোচনা করা হয়েছে। পৃথিবীর উপর কোটি কোটি স্থান থাকলেও অক্ষরেখা (Latitude) এবং দ্রাঘিমারেখা (Longitude)-এর সাহায্যে প্রতিটি স্থানের একটি নির্দিষ্ট ঠিকানা নির্ধারণ করা যায়।
১. অবস্থান (Location) কী?
পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠে কোনো স্থানের নির্দিষ্ট স্থান বা ঠিকানাকেই অবস্থান বলে।
অবস্থান দুই ধরনের—
(ক) আপেক্ষিক অবস্থান (Relative Location)
কোনো স্থানকে তার আশেপাশের স্থান, নদী, পাহাড়, সমুদ্র ইত্যাদির তুলনায় বোঝানো হয়।
উদাহরণ:
কলকাতা হুগলি নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত।
দিল্লি যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত।
(খ) পরম অবস্থান (Absolute Location)
অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের সাহায্যে কোনো স্থানের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করাকে পরম অবস্থান বলে।
উদাহরণ:
কলকাতা → প্রায় 22°34′ উত্তর অক্ষাংশ এবং 88°22′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ।
২. পৃথিবীর আকৃতি
পৃথিবী সম্পূর্ণ গোল নয়।
এটি জিওয়েড (Geoid) আকৃতির।
অর্থাৎ—
মেরু অঞ্চলে সামান্য চাপা
বিষুবরেখায় কিছুটা স্ফীত
৩. অক্ষ (Axis)
উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুকে সংযোগকারী কাল্পনিক রেখাকে পৃথিবীর অক্ষ বলে।
বৈশিষ্ট্য
এটি কাল্পনিক।
পৃথিবী এই অক্ষের উপর ঘোরে।
অক্ষের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২,৭১৪ কিমি।
৪. মেরু (Poles)
দুটি মেরু রয়েছে—
উত্তর মেরু (North Pole)
দক্ষিণ মেরু (South Pole)
৫. বিষুবরেখা (Equator)
পৃথিবীর মাঝখান দিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে অঙ্কিত সর্ববৃহৎ কাল্পনিক বৃত্তকে বিষুবরেখা বলে।
অক্ষাংশ = ০°
বৈশিষ্ট্য
পৃথিবীকে দুই সমান ভাগে ভাগ করে।
উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধ সৃষ্টি হয়।
এটি সবচেয়ে বড় অক্ষরেখা।
৬. গোলার্ধ (Hemisphere)
বিষুবরেখা পৃথিবীকে দুই ভাগে ভাগ করেছে—
উত্তর গোলার্ধ
দক্ষিণ গোলার্ধ
আবার প্রধান দ্রাঘিমারেখা ভাগ করেছে—
পূর্ব গোলার্ধ
পশ্চিম গোলার্ধ
৭. অক্ষরেখা (Latitude)
পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত এবং বিষুবরেখার সমান্তরাল কাল্পনিক বৃত্তগুলিকে অক্ষরেখা বলে।
বৈশিষ্ট্য
পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত।
একে অপরের সমান্তরাল।
কখনও মিলিত হয় না।
মোট ১৮১টি অক্ষরেখা ধরা হয় (০°-সহ)।
সর্ববৃহৎ অক্ষরেখা হলো বিষুবরেখা।
৮. অক্ষাংশ (Latitude)
বিষুবরেখা থেকে উত্তর বা দক্ষিণে কোনো স্থানের কৌণিক দূরত্বকে অক্ষাংশ বলে।
পরিমাপ—
০° থেকে ৯০° উত্তর
০° থেকে ৯০° দক্ষিণ
৯. গুরুত্বপূর্ণ অক্ষরেখা
| অক্ষরেখা | মান |
|---|---|
| বিষুবরেখা | 0° |
| কর্কটক্রান্তি রেখা | 23½° উত্তর |
| মকরক্রান্তি রেখা | 23½° দক্ষিণ |
| উত্তর মেরুবৃত্ত | 66½° উত্তর |
| দক্ষিণ মেরুবৃত্ত | 66½° দক্ষিণ |
১০. দ্রাঘিমারেখা (Longitude)
উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত অঙ্কিত অর্ধবৃত্তাকার কাল্পনিক রেখাকে দ্রাঘিমারেখা বলে।
বৈশিষ্ট্য
উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত।
সব রেখা মেরুতে মিলিত হয়।
সমান দৈর্ঘ্যের।
মোট ৩৬০টি দ্রাঘিমারেখা।
১১. প্রধান দ্রাঘিমারেখা (Prime Meridian)
গ্রিনিচ-এর উপর দিয়ে অতিক্রান্ত ০° দ্রাঘিমারেখা-কে প্রধান দ্রাঘিমারেখা বলে।
বৈশিষ্ট্য
পৃথিবীকে পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধে ভাগ করে।
এখান থেকেই সময় গণনা শুরু হয়।
১২. দ্রাঘিমাংশ
প্রধান দ্রাঘিমারেখা থেকে পূর্ব বা পশ্চিমে কোনো স্থানের কৌণিক দূরত্বকে দ্রাঘিমাংশ বলে।
পরিমাপ
০°–১৮০° পূর্ব
০°–১৮০° পশ্চিম
১৩. গ্রিড (Grid)
অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখার ছককে গ্রিড বলে।
এই গ্রিড ব্যবহার করে পৃথিবীর যেকোনো স্থানের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা যায়।
১৪. স্থানাঙ্ক (Coordinates)
অক্ষাংশ + দ্রাঘিমাংশ = স্থানাঙ্ক
উদাহরণ
কলকাতা
22°34′N, 88°22′E
১৫. সময় ও দ্রাঘিমার সম্পর্ক
পৃথিবী ২৪ ঘণ্টায় ৩৬০° ঘোরে।
১ ঘণ্টায় = ১৫°
১° = ৪ মিনিট
সূত্র
সময়ের পার্থক্য = দ্রাঘিমার পার্থক্য × ৪ মিনিট
১৬. ভারতীয় প্রমাণ সময় (IST)
ভারতের প্রমাণ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে 82°30′ পূর্ব দ্রাঘিমারেখা ধরে।
এই রেখাটি মির্জাপুর-এর নিকট দিয়ে গেছে।
১৭. আন্তর্জাতিক দিন পরিবর্তন রেখা (International Date Line)
আন্তর্জাতিক দিন পরিবর্তন রেখা প্রায় ১৮০° দ্রাঘিমারেখা অনুসরণ করে।
কাজ
পূর্ব থেকে পশ্চিমে অতিক্রম করলে ১ দিন যোগ হয়।
পশ্চিম থেকে পূর্বে অতিক্রম করলে ১ দিন বিয়োগ হয়।
গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
| অক্ষরেখা | দ্রাঘিমারেখা |
|---|---|
| পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত | উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত |
| সমান্তরাল | মেরুতে মিলিত |
| পূর্ণবৃত্ত | অর্ধবৃত্ত |
| দৈর্ঘ্য ভিন্ন | সবগুলির দৈর্ঘ্য সমান |
| অক্ষাংশ নির্দেশ করে | দ্রাঘিমাংশ নির্দেশ করে |
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (Exam Point)
পৃথিবীর আকৃতি → জিওয়েড
বিষুবরেখা → ০° অক্ষাংশ
প্রধান দ্রাঘিমারেখা → ০° দ্রাঘিমা
কর্কটক্রান্তি রেখা → ২৩½° উত্তর
মকরক্রান্তি রেখা → ২৩½° দক্ষিণ
উত্তর মেরুবৃত্ত → ৬৬½° উত্তর
দক্ষিণ মেরুবৃত্ত → ৬৬½° দক্ষিণ
পৃথিবীর মোট দ্রাঘিমারেখা → ৩৬০টি
পৃথিবীর মোট অক্ষরেখা (০°-সহ) → ১৮১টি
১° দ্রাঘিমার সময় → ৪ মিনিট
১৫° দ্রাঘিমা → ১ ঘণ্টা
ভারতের প্রমাণ সময় → ৮২°৩০′ পূর্ব দ্রাঘিমা (IST)
সপ্তম শ্রেণী ভূগোল – দ্বিতীয় অধ্যায়
ভূপৃষ্ঠে কোনো স্থানের অবস্থান নির্ণয়
২০টি গাণিতিক (Mathematical) সমস্যা ও সমাধান
(WBBSE | Class 7 Geography | Latitude, Longitude & Time Calculation)
১. ১৫° দ্রাঘিমার পার্থক্যের জন্য সময়ের পার্থক্য কত?
সমাধান:
১° = ৪ মিনিট
⇒ ১৫° = ১৫ × ৪
= ৬০ মিনিট = ১ ঘণ্টা
উত্তর: ১ ঘণ্টা
২. ২৫° দ্রাঘিমার পার্থক্যের জন্য সময়ের পার্থক্য কত?
সমাধান
২৫ × ৪ = ১০০ মিনিট
= ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট
উত্তর: ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট
৩. ৪৫° দ্রাঘিমার পার্থক্যের জন্য সময়ের পার্থক্য নির্ণয় কর।
সমাধান
৪৫ × ৪
= ১৮০ মিনিট
= ৩ ঘণ্টা
উত্তর: ৩ ঘণ্টা
৪. ৭° দ্রাঘিমার পার্থক্যের জন্য সময়ের পার্থক্য নির্ণয় কর।
সমাধান
৭ × ৪
= ২৮ মিনিট
উত্তর: ২৮ মিনিট
৫. ৯০° দ্রাঘিমার পার্থক্যের জন্য সময়ের পার্থক্য নির্ণয় কর।
সমাধান
৯০ × ৪
= ৩৬০ মিনিট
= ৬ ঘণ্টা
উত্তর: ৬ ঘণ্টা
৬. ১৩৫° দ্রাঘিমার পার্থক্যের জন্য সময় নির্ণয় কর।
সমাধান
১৩৫ × ৪
= ৫৪০ মিনিট
= ৯ ঘণ্টা
উত্তর: ৯ ঘণ্টা
৭. কলকাতা (৮৮°E) ও দিল্লি (৭৭°E)-এর সময়ের পার্থক্য কত?
সমাধান
৮৮° − ৭৭°
= ১১°
১১ × ৪
= ৪৪ মিনিট
উত্তর: ৪৪ মিনিট
৮. যদি গ্রিনিচে সময় সকাল ১০টা হয়, তবে ৩০° পূর্ব দ্রাঘিমায় সময় কত?
সমাধান
৩০ × ৪
= ১২০ মিনিট
= ২ ঘণ্টা
পূর্বে সময় বাড়ে।
১০ + ২
= ১২টা
উত্তর: দুপুর ১২টা
৯. গ্রিনিচে সকাল ৮টা হলে ৪৫° পশ্চিম দ্রাঘিমায় সময় কত?
সমাধান
৪৫ × ৪
= ১৮০ মিনিট
= ৩ ঘণ্টা
পশ্চিমে সময় কমে।
৮ − ৩
= সকাল ৫টা
উত্তর: সকাল ৫টা
১০. ৮২°৩০′ পূর্ব দ্রাঘিমা থেকে ৯৭°৩০′ পূর্ব দ্রাঘিমার সময়ের পার্থক্য কত?
সমাধান
৯৭°৩০′ − ৮২°৩০′
= ১৫°
১৫ × ৪
= ৬০ মিনিট
উত্তর: ১ ঘণ্টা
১১. ১৮০° দ্রাঘিমার সময়ের পার্থক্য কত?
সমাধান
১৮০ × ৪
= ৭২০ মিনিট
= ১২ ঘণ্টা
উত্তর: ১২ ঘণ্টা
১২. ৬০° দ্রাঘিমার সময়ের পার্থক্য নির্ণয় কর।
সমাধান
৬০ × ৪
= ২৪০ মিনিট
= ৪ ঘণ্টা
উত্তর: ৪ ঘণ্টা
১৩. পৃথিবী ২৪ ঘণ্টায় ৩৬০° ঘোরে। ১ ঘণ্টায় কত ডিগ্রি ঘোরে?
সমাধান
৩৬০ ÷ ২৪
= ১৫°
উত্তর: ১৫°
১৪. পৃথিবী ১ ঘণ্টায় ১৫° ঘোরে। ৮ ঘণ্টায় কত ডিগ্রি ঘুরবে?
সমাধান
১৫ × ৮
= ১২০°
উত্তর: ১২০°
১৫. পৃথিবী ৬ ঘণ্টায় কত ডিগ্রি ঘোরে?
সমাধান
১৫ × ৬
= ৯০°
উত্তর: ৯০°
১৬. ৭৫° পূর্ব দ্রাঘিমায় সময় দুপুর ২টা হলে ১০৫° পূর্ব দ্রাঘিমায় সময় কত?
সমাধান
১০৫ − ৭৫
= ৩০°
৩০ × ৪
= ১২০ মিনিট
= ২ ঘণ্টা
২ + ২
= বিকেল ৪টা
উত্তর: বিকেল ৪টা
১৭. ১২০° পশ্চিম দ্রাঘিমায় সকাল ৯টা হলে গ্রিনিচে সময় কত?
সমাধান
১২০ × ৪
= ৪৮০ মিনিট
= ৮ ঘণ্টা
পশ্চিমে সময় পিছিয়ে থাকে।
৯ + ৮
= বিকেল ৫টা
উত্তর: বিকেল ৫টা
১৮. ৩০° উত্তর অক্ষাংশ থেকে ৬০° উত্তর অক্ষাংশের কৌণিক দূরত্ব কত?
সমাধান
৬০° − ৩০°
= ৩০°
উত্তর: ৩০°
১৯. ২০° দক্ষিণ অক্ষাংশ থেকে ৫০° দক্ষিণ অক্ষাংশের দূরত্ব কত?
সমাধান
৫০° − ২০°
= ৩০°
উত্তর: ৩০°
২০. ১৫° উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২৫° দক্ষিণ অক্ষাংশের কৌণিক দূরত্ব কত?
সমাধান
১৫° + ২৫°
= ৪০°
(কারণ দুটি ভিন্ন গোলার্ধে অবস্থিত)
উত্তর: ৪০°
মনে রাখার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র (Formula Box)
✅ ১° দ্রাঘিমা = ৪ মিনিট
✅ ১৫° দ্রাঘিমা = ১ ঘণ্টা
✅ সময়ের পার্থক্য = দ্রাঘিমার পার্থক্য × ৪ মিনিট
✅ পূর্ব দিকে গেলে সময় বাড়ে (+)
✅ পশ্চিম দিকে গেলে সময় কমে (−)
✅ ১ ঘণ্টায় পৃথিবী ঘোরে = ১৫°
✅ ২৪ ঘণ্টায় পৃথিবী ঘোরে = ৩৬০°
এই ২০টি অঙ্ক WBBSE সপ্তম শ্রেণীর ভূগোলের "ভূপৃষ্ঠে কোনো স্থানের অবস্থান নির্ণয়" অধ্যায়ের ধারণাভিত্তিক ও পরীক্ষা-উপযোগী গাণিতিক প্রশ্ন।


0 Comments