পর্যটনের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Tourism)
পর্যটনকে তাদের প্রকৃতি অনুযায়ী বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়।
ক) ইকোট্যুরিজম (Ecotourism): ইকোট্রারিজম একধরনের পরিবেশ বান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা যেখানে পরিবেশকে রক্ষা করে পর্যটন ব্যবস্থা চালানো হয়। এই ব্যবস্থায় নির্বিঘ্নে৷ প্রাকৃতিক এলাকায় পরিবেশের উপর নিম্ন প্রভাব রেখে বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষার চেষ্টা করে পর্যটন চালানো হয়। এর অর্থ প্রাকৃতিক অঞ্চলে দায়বদ্ধ ভ্রমণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের উন্নতিসাধন। কেরল ভারতের মধ্যে প্রথম পরিকল্পিত ইকোট্যুরিজম গন্তব্য। ইকোট্যুরিজম বিষয়টি বিংশ শতাব্দীর শেষে পর্যটন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হয়।
খ) সাংস্কৃতিক পর্যটন (Cultural Tourism): কিছু পর্যটক অন্যান্য ব্যক্তি ব সম্প্রদায়ের জীবনধারণ পদ্ধতি জানতে আগ্রহী হয়। এই পর্যটকেরা সাংস্কৃতিক মিল ও অমিল খুঁজে বার করতে চায়। এই পর্যটনে সাংস্কৃতিক আগ্রহের সাথে ঐতিহাসিক আগ্রহ জড়িত থাকে। পর্যটকেরা গন্তব্যের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য জানার সাথে সাথে ঐ স্থানের ইতিহাস অনুসন্ধান করতে চায়, সুতরাং জ্ঞান অর্জনের জন্য, সংস্কৃতিকে ভালভাবে বোঝার জন্য ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য এই ধরনের সাংস্কৃতিক পর্যটন পরিচালিত হয়। পর্যটকেরা গন্থবোর সংগ্রহশালা, থিয়েটার, আর্ট গ্যালারি, স্থপতি ও প্রাচীন ইমারত ভ্রমণ করে। রোমের কলোসিয়াম, আগ্রার তাজমহল, জার্মানির বার্লিন ওয়াল দেখতে যাওয়া এই ধরনের পর্যটনের উদাহরণ।
গ) দু:সাহসিক পর্যটন বা অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম (Adventure Tourism): এটি এমন এক পর্যটন ব্যবস্থা যেখানে অ্যাডভেঞ্চার প্রেমী মানুষেরা দুর্গম ও দুর্ভেদ্য প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে পর্যটনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। সাধারণত যুবক ও যুবতীদের মধ্যে দু:সাহসিক পর্যটনে অংশ নেওয়ার ধারা রয়েছে। তারা সাধারণত ট্রেকিং, গো-বোর্ডিং, রক ক্লাইম্বিং, রিভার রাফটিং, বাঞ্জি জাম্পিং, মাউন্টেন বাইকিং, রাফ্টিং, স্কেটিং ইত্যাদি দু:সাহসিক পর্যটনে যান। তারা ক্যাম্প ফায়ারের আয়োজন করে এবং নীল আকাশের নীচ থেকে পরিবেশকে উপভোগ করতে চায়। এই পর্যটন চাপ সহ্য করতে পারে এমন দৃঢ় স্নায়ুযুক্ত ব্যক্তির জন্য সঠিক। নেপালের পর্বতারোহণ, ক্রোয়েশিয়ার রক ক্লাইম্বিং ও মাউন্টেন বাইকিং এবং নিউজিল্যান্ডের স্কিইং ও মো-বোর্ডিং এই ধরনের দুঃসাহসিক পর্যটনের উদাহরণ।
ঘ) স্বাস্থ্য পর্যটন বা চিকিৎসা পর্যটন (Health Tourism or Medical Tourism): সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, স্বাস্থ্য পর্যটন অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মানুষ রোগ নিরাময়ের জন্য প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র ও হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য বিদেশেও পৌঁছে যায়। এই পর্যটন স্বাস্থ্য পর্যটন বা চিকিৎসা পর্যটন নামে পরিচিত। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও অনুন্নত দেশে এই স্বাস্থ্য পর্যটনের মাধ্যমে চিকিৎসার জন্য পৌঁছে যান। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার জন্য চেন্নাই ও ভেলরে যায়, যা এই ধরনের পর্যটনের উদাহরণ।
ঙ) ধর্মীয় পর্যটন (Pilgrimage Tourism): ধর্মীয় আচরণের উদ্দেশ্যে পর্যটন ধর্মীয় পর্যটন নামে পরিচিত। মুসলিমদের আরব যাত্রা, খৃস্টানদের রোম যাত্রা, হিন্দুদের ভারত ভ্রমণ, বৌদ্ধদের তিব্বত যাত্রা এই ধর্মীয় পর্যটনের উদাহরণ। মানুষের ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে এবং ধর্মীয় গুরুত্বের জায়গাগুলি ঘুরে দেখার জন্য বিভিন্ন ধরনের আন্তর্দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্যাকেজ ট্যুরের আয়োজন করা হয়, যেমন- চারধাম যাত্রা।
চ) আন্তর্জাতিক পর্যটন (International Tourism): মানুষ যখন পর্যটনের উদ্দেশ্যে নিজের দেশের সীমানা অতিক্রম করে অন্য দেশে পাড়ি দেয়, তখন. তাকে আন্তর্জাতিক পর্যটন বলে। সাম্প্রতিক কালে বিশ্বায়নের সুফলে ও আর্থিক সক্ষমতার বলে, মানুষ অবসর যাপনের জন্য বিদেশে পৌঁছে যাচ্ছে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার' মতে, পর্যটক হল এমন এক ব্যক্তি, যিনি অবসর, ব্যবসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য একটানা এক বছরের কম সময় ধরে নিজের স্বাভাবিক পরিবেশের বাইরের স্থানে ভ্রমণ করেন এবং থাকেন। আন্তর্জাতিক পর্যটন বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য উন্নয়নের হাতিয়ার রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। আমাদের পৃথিবীতে প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে ১ জন মানুষ পর্যটনের সাথে যুক্ত। পর্যটন ক্ষেত্রের উন্নতির জন্য বিশ্বের প্রতিটি দেশই প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে।
ছ) আন্তদেশীয় পর্যটন ( Domestic Tourism / National Tourism): আন্তর্দেশীয় পর্যটন বলতে, নিজের দেশের সীমানার মধ্যে পরিচালিত পর্যটন ব্যবস্থাকে বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ, একজন কানাডিয়ান ব্যক্তি যদি তার দেশের নায়াগ্রা জলপ্রপাতে কিছু দিন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন, তবে এটি হল আন্তর্দেশীয় বা অভ্যন্তরীণ পর্যটন। বিশ্বব্যাপী দেশীয় পর্যটন দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেশের মধ্যেই অর্থের বিনিময়কে উন্নত করে এবং পর্যটনের জন্য দেশের নাগরিকদের অর্থের সাশ্রয় করে। আন্তর্দেশীয় পর্যটন দেশের নাগরিকদের তাদের দেশের ইতিহাস এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতন করে। এই জাতীয় পর্যটন দর্শনার্থীদের জন্য সুবিধাজনক, কারণ নিজের দেশের মধ্যে ভ্রমণে কোনও ভাষার পার্থক্য, মুদ্রার বিনিময়ের পার্থক্য, খাদ্য পরিবর্তন বা শিষ্টাচারের পার্থক্য দেখা দেয় না। আন্তর্দেশীয় পর্যটন স্বল্প পরিসরে, স্বল্প ব্যয়ে অবসরযাপন ও চিত্ত বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
জ) বিনোদনমূলক পর্যটন (Recreational Tourism): পর্যটন-এর একটি প্রধান উদ্দেশ্য হল বিনোদন। পৃথিবীর বেশিরভাগ পর্যটকই বিনোদনের উদ্দেশে পর্যটনে অংশগ্রহণ করে; এই কারণেই বর্তমান সময়ে বিনোদনমূলক প্যাকেজ ট্যুরগুলি এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ঝ) পরিবেশগত পর্যটন (Environmental Tourism): পর্যটকেরা সাধারণত প্রাকৃতিক নির্মল পরিবেশে পর্যটনে যেতে পছন্দ করে। এই কারণে দুর্গম স্থানের প্রাকৃতিক পরিবেশে যেতেও মানুষের আপত্তি থাকে না।
ঞ) ঐতিহাসিক পর্যটন (Historical Tourism): আমাদের পূর্বপুরুষ কীভাবে কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলে বাস করতেন এবং তারা কিভাবে দেশ পরিচালনা করেছিলেন তা জানতে পর্যটকরা আগ্রহী। এই কারণে তারা ঐতিহ্যবাহী ঐতিহাসিক স্থান, মন্দির, গীর্জা, যাদুঘর, দুর্গ ইত্যাদিতে পর্যটনের উদ্দেশ্যে যেতে পছন্দ করে।
ট) জাতিগত পর্যটন (Racial Tourism or Birth Tourism): একই জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা বর্তমানে সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে। তবে রক্তের টানে প্রতিটি মানুষ তার উৎস অঞ্চলে যেতে চায়। বিবাহ এবং মৃত্যু মানুষকে তাদের জন্মস্থানে একত্রিত করে। যে সমস্ত ব্যক্তি বিদেশে বসবাস করেন তারা তাদের জন্মের স্থানটি পরিদর্শনে এলে বিষয়টি জাতিগত পর্যটনের অন্তর্ভুক্ত।
(ঠ) সঙ্গীত পর্যটন (Music Tourism): এটি আনন্দ উপভোগের অংশ হতে পারে কারণ এতে মানুষ গান গাইতে বা শুনতে যায়। পৃথিবীর বহু সনামধন্য সংগীতশিল্পী ভারতে এসে সঙ্গীত পরিবেশন করেন বা কোনও ব্যক্তি সঙ্গীত শুনতে বিদেশ যাত্রা করেন, এই দুটি বিষয় সঙ্গীত পর্যটনের উদাহরণ। ড) গ্রাম্য পর্যটন (Village Tourism): বিভিন্ন গ্রামের পর্যটন গন্তব্যগুলিতে যে পর্যটন ব্যবস্থা চলে, তাকে গ্রাম্য পর্যটন বলে।
চ) বনাজীবন পর্যটন (Wildlife Tourism): এটি পরিবেশ এবং প্রাণী বান্ধব পর্যটন। বন্যজীবন পর্যটন অর্থে বন্য প্রাণীকে তাদের প্রাকৃতিক আবাসে দেখা। সুন্দরবন পর্যটন, গরুমারা অভয়ারণ্যে পর্যটন এই বন্যজীবন পর্যটনের উদাহরণ।
গ) চিরাচরিত পর্যটন (Traditional Tourism): এই পর্যটন ব্যবস্থায় কোনও স্থানে ভ্রমণের জন্য ভ্রমণের কয়েক দিন বা এক সপ্তাহ আগে পরিকল্পনা করা হয়। এক্ষেত্রে, ভ্রমণের স্থান, ভ্রমণের পদ্ধতি ও ভ্রমণের পরিসর পূর্ব পরিকল্পিত। এক্ষেত্রে সফর পরিচালকরা গন্তব্যের বিখ্যাত স্থানগুলি ভ্রমণের পরামর্শ দেয়, যার ফলে পর্যটন গন্তব্যের স্থানকে তুলনামূলক কম অধ্যয়ন করা হয়। পর্যটকেরা মূলত স্থানটির স্মৃতিচিহ্ন এবং নির্দিষ্ট স্থান দেখার জন্য আগ্রহ থাকে। এই পর্যটনের ক্ষেত্রে পর্যটকের স্থানীয় অর্থনীতি, সংস্কৃতি এ পরিবেশের প্রতি যত্নবান হয় না।
ত) বিষাদমূলক পর্যটন ( Dark Tourism): এটি এমন পর্যটন যা ভ্রমণের স্থানগুলির ঐতিহাসিক কোনও মৃত্যুর ঘটনা এবং ট্র্যাজেডির সাথে সম্পর্কিত। ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের জালিয়ানওয়ালাবাগ, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরো এই ধরনের পর্যটনের সাথে সম্পর্কিত।
থ) বিপর্যয় পর্যটন (Disaster Tourism); পদবাচ্যটি বিষয়টিকে সঠিক ভাবে উপস্থাপিত করতে পারে না। এই ধরনের পর্যটনের সাথে এমন কোনও স্থান ভ্রমণ বোঝায় যেখানে কোনও এক সময় কোনও প্রাকৃতিক বা অপ্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটেছিল। জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ২০১১ সালে পারমাণবিক বিস্ফোরণ হয়, বর্তমানে ঐ বিপর্যয়ের নিদর্শন পর্যটকেরা দেখতে যায়, এটি বিপর্যয় পর্যটনের উদাহরণ।
দ) ডুম পর্যটন (Doom Tourism): ২০০৭ সালে প্রথম এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বিশ্ব পর্যটনে এই বিষয়টি বর্তমানে বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। এই পর্যটন সেই সকল স্থানগুলির ভ্রমণকে বোঝায় যে স্থানগুলি পরিবেশ বা মানুষের দ্বারা বিপদগ্রস্থ। এই সকল স্থানগুলি দেখার উদ্দেশ্যে পর্যটকদের উৎকণ্ঠা অনেক বেশি থাকে, কারণ এই সকল স্থানের ভবিষ্যত অস্তিত্ব আর থাকে না। চিলির দক্ষিণ প্যাটাগনিয়া অঞ্চলের আমালিয়া হিমবাহ এই ধরনের ডুম পর্যটন গন্থব্যের উদাহরণ।
ধ) ড্রাগ পর্যটন (Drug Tourism): পৃথিবীর বহু দেশে নেশার উদ্দেশ্যে ড্রাগ, গ্রহণ বেআইনি নয়। পৃথিবীর বহু দেশের বহু পর্যটক এই উদ্দেশ্যে পৃথিবীর বহু দেশে পৌঁছে যায়। নেদারল্যান্ডের আমস্টারডাম, মরক্কোর রীফ পার্বত্য অঞ্চল, অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলশ অঞ্চলের নিমবিন এই ধরনের পর্যটন গন্থর।
ন) কুলুঙ্গী পর্যটন (Niche Tourism): বিশেষত নির্দিষ্ট কোনও উদ্দেশ্যে স্বল্প সংখ্যক সদস্যদের নিয়ে যে পর্যটন গড়ে ওঠে তাকে কুলুঙ্গী পর্যটন বলে। এটি প্রকৃতপক্ষে এক ধরনের 'বিশেষায়িত পর্যটন' (Specialised tourism)। এই পর্যটন বিশেষ কিছু সংখ্যক ব্যক্তির দলবদ্ধ পর্যটন। সাম্প্রতিক কালে ‘প্যাকেজ ট্যুর'-এর পরিবর্তে এই 'কুলুঙ্গী পর্যটন' ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। সাম্প্রতিক পর্যটকেরা পরোক্ষ পর্যবেক্ষক হওয়ার পরিবর্তে, পর্যটন গন্তব্যের স্থানীয় রীতিনীতি, ঐতিহ্য ও খাদ্যাভাসের সাথে অভিজ্ঞতা লাভ করতে চায়, স্বাদ ও অনুভূতির সাথে সম্পর্কিত হতে চায়, যার ভিত্তিতেই কুলুঙ্গী পর্যটনের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।
0 Comments