রাজনৈতিক ভূগোলের প্রাসঙ্গিক বিষয়সমূহ Relevant theme of Political Geography// important topic
রাষ্ট্র (State) :
সাধারণভাবে রাষ্ট্র বলতে বোঝায় সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন কোন রাজনৈতিক এলাকাকে। তবে রাষ্ট্রের সংজ্ঞা নির্ধারণে আজ পর্যন্ত কোন মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ডেভিড ইসটন এর দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায় রাষ্ট্রের 145টি সংজ্ঞা রয়েছে। দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতে সাবলম্বী ও পরিপূর্ণ জীবন-যাপনের উদ্দেশ্যে সংগঠিত কয়েকটি পরিবার ও গ্রামের সমষ্টিই হল রাষ্ট্র। আবার, লেনিনের ভাষায় রাষ্ট্র হল একটি শ্রেণির ওপর অন্য একটি শ্রেণির উৎপীড়নের যন্ত্রবিশেষ। আধুনিককালে দেওয়া দার্শনিক গার্নারের সংজ্ঞাটি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তাঁর মতে রাষ্ট্র হল একটি জনসমাজ যা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বহিশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত থেকে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। এবং যার একটি সুগঠিত শাসন ব্যবস্থা আছে। এবং ঐ শাসনব্যবস্থার প্রতি অধিকাংশ জনগণ স্বাভাবিক আনুগত্য প্রকাশ করে।
রাষ্ট্রের কতগুলি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় যেমন—
(i) জনসমষ্টি
(ii) নির্দিষ্ট ভূখন্ড
(iii) সরকার
(iv) সার্বভৌমিকতা
(v) স্থায়িত্ব
(vi) জাতীয়তাবাদ।
রাজনৈতিক ভূগোলে রাষ্ট্রের কার্যাবলী হিসাবে জনগণের আইনশৃঙ্খলা, রাষ্ট্রভেদে মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মধারা প্রভৃতির আলোচনা গুরুত্ব পায়।
জাতি ( Nation)
Nation শব্দটি তৈরী হয়েছে ল্যাটিন শব্দ ‘Natio' থেকে। যার অর্থ জন্ম বা (Born)। জাতি হল এমন এক গোষ্ঠী যে সামগ্রিকভাবে গোষ্ঠী আনুগত্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে। জন স্টুয়ার্টমিলের সংজ্ঞানুসারে জাতি হল মানব জাতির একটা অংশ যারা সাধারণ সহানুভূতির দ্বারা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। জাতির ধারণাটি সম্পূর্ণভাবে ভৌগোলিক অর্থাৎ সীমানাভিত্তিক ধারণা।
রাজনৈতিক ভূগোলে জাতির ধারণা জাতিভিত্তিক রাষ্ট্রের অন্তর্গত জাতিকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক ভূগোলে একটি প্রধান আলোচ্য বিষয়।
জাতি-রাষ্ট্রের ধারণা ( Nation State Concept) : জাতি রাষ্ট্রের গঠনে দুটি কেন্দ্রীয় উপাদান রয়েছে। যার প্রথমটি রাষ্ট্র নির্মাণের পদ্ধতি। দ্বিতীয়টি জাতি নির্মাণের পদ্ধতি। প্রকৃতপক্ষে জাতি রাষ্ট্রের ধারণাটি ব্যাপ্তিস্থানিক শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কায়িক রূপ হিসাবে পরিগণিত হয় অর্থাৎ সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে একক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং তার অন্তর্গত জনগণের একটি একধাচের জীবনযাত্রার অভ্যাস জাতি রাষ্ট্রের আদর্শটিকে দৃঢ় করে। ডেনমার্ককে একটি আদর্শ জাতিরাষ্ট্রে বলা চলে কারণ ডেনিসরা মূলত দীর্ঘদিন ধরে একই অঞ্চলে বসবাস করছেন এবং এদেশে তাদের সংস্কৃতি ছাড়া অন্যকোন সংস্কৃতি বা জাতিসত্ত্বার বিশেষ কোন অস্তিত্ব নেই।
কেন্দ্রক অঞ্চল (Core Area) :
কেন্দ্রভূমি হল রাষ্ট্রের এমন একটি অঞ্চল বা অংশ যেখান থেকে একটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি বা উৎপত্তি হয়। 1897 সালে র্যাটজেল প্রথম এই কেন্দ্রক অঞ্চলের ধারণা প্রবর্তন করেন। তাঁর মতে রাষ্ট্র হল নির্দিষ্ট রাজ্যসীমার একক যা বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজনৈতিক একককে গ্রাস করে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এবং এই প্রক্রিয়া নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। রিচার্ড মুরের বক্তব্য অনুযায়ী কেন্দ্রক অঞ্চল হল অতীত ও বর্তমানের রাজনৈতিক প্রাধান্যযুক্ত অঞ্চল, সচেতনতার অঞ্চল, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধের অঞ্চল। রাজনৈতিক ভূগোলে ব্যাপ্তিস্থানের মধ্যে রাজনৈতিক অঞ্চল ও তার বৃদ্ধিতে কেন্দ্রত অঞ্চলের আলোচনা গুরুত্ব পায়। শ্রেণিবিভাগ :
উৎস স্থান থেকে ধীরে ধীরে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রক অঞ্চলকে দুভাগে ভাগ করা
(1) কালানুক্রমিক কেন্দ্র অঞ্চল
(2) রাষ্ট্রীয় অঞ্চলের সাপেক্ষে অবস্থানরত কেন্দ্র অল কার্যবিচারে কেন্দ্রক অঞ্চল 5 ভাগে বিভক্ত যথা
(i) উৎসমূলত কেন্দ্র অঞ্চল (ii) জাতীয় কেন্দ্রক অঞ্চল (iii) অর্থনৈতিক কেন্দ্রক অঞ্চল (iv) স্থানান্তরী কেন্দ্রক অঞ্চল (v) সম্পূরক কোক অঞ্চল।
নিরপেক্ষ অঞ্চল (Buffer Zone)
Buffer Zone বা নিরপেক্ষ অঞ্চল হল একটি যান্ত্রিকব্যবস্থা। যা কিনা পরস্পর বিরোধী দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে বা সংঘর্ষ এড়াতে কাজ করে। ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে নিরপেক্ষ অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীন। সারা বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন দেশ একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ, যুদ্ধ এবং কুটনৈতিক চাপের রাজনৈতিক আবর্তে আবদ্ধ রয়েছে। এছাড়া সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা অর্থনৈতিক দিকও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বা একই রাষ্ট্রের অন্তর্গত বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে একটা বিভেদ বা দূরত্ব তৈরি করে। এক্ষেত্রে কোন ভূখণ্ড বা অঞ্চল বা রাষ্ট্র এমন ভূমিকা নেয় যে তখন বিবাদমান রাজ্য বা রাষ্ট্রগুলি তাকে নিরপেক্ষ সঙ্গী মনে করে তাকে সমন্বয় ও সুষ্ঠ সমাধানের দ্য হিসাবে ব্যবহার করে। ঐসকল রাজ্য বা দেশগুলি নিরপেক্ষ অঞ্চল (Buffer Zone) হিসাবে পরিচিত হয়। যেহেতু এগুলির একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় ও সীমানা থাকে তাই তাকে শুধুমাত্র সীমান্তবর্তী (Ponticer) অঞ্চল বলা যায় না। নিরপেক্ষ অঞ্চল দুধরনের হতে পারে যথা—
(1) স্থলগত নিরপেক্ষ অঞ্চল (2) সামুদ্রিক নিরপেক্ষ অঞ্চল। যেমন- বলিভিয়া প্যারাগুয়ের মত দেশগুলি ব্রাজিল ও চিলির মধ্যে নিরপেক্ষ অঞ্চল হিসাবে ব্যবহৃত হয়। একইভাবে নেপাল, ভুটান, ভারত এবং চীনের মধ্যে নিরপেক্ষ অঞ্চল হিসাবে ভূমিকা গ্রহণ করে। এগুলি স্থলগত নিরপেক্ষ অঞ্চল। পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার তামিল ও ভারতের তামিলদের ব্যাপ্তিস্থানিক অবস্থানের মধ্যে ভারত মহাসাগর একটি সামুদ্রিক নিরপেক্ষ অঞ্চলরূপে প্রতিপন্ন হয়। তবে একথা সত্যি যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিরপেক্ষ অঞ্চলের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা বদলাতে শুরু করে অর্থাৎ যে অঞ্চল বা রাষ্ট্র আজকে নিরপেক্ষ অঞ্চল সে কালকে নাও থাকতে পারে আবার পরবর্তীকালে নতুন কোন রাজনৈতিক বিষয়ে নিরপেক্ষ অঞ্চল সৃষ্টি হতে পারে।
নিরপেক্ষ রাষ্ট্র (Buffer State) :
সীমানা বা কোন আঞ্চলিক বিরোধ দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে তুলতে পারে। বিংশ শতাব্দীতে ইউরোপে এই কারণে দুটি বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এজন্য অনেক দেশই শত্রুভাবাপন্ন প্রতিবেশীকে দূরে সরিয়ে রাখার উদ্দেশে দুই রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যবর্তী অঞ্চলে ছোট ছোট রাষ্ট্রের (Buffer State) সৃষ্টি করেছে। সাধারণত দুটি বড় শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রকে দুপাশে রেখে তাই মধ্যবর্তী রাষ্ট্র নিরপেক্ষ অঞ্চল হিসাবে গড়ে ওঠে। যেমন এশিয়ায় ভারত।ও চীনের মাঝে নেপাল ও ভুটান মধ্যবর্তী রাষ্ট্রহিসাবে গড়ে উঠেছে।
ইকুমেন (The Ecumene) :
গ্রীক শব্দ Dikoumene থেকে Ecumcne শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। অতীতে গ্রীকেরা এই শব্দটির দ্বারা বসতযোগ্য এলাকে নির্দেশ করত। 1928 খ্রীষ্টাব্দে Mark Jefferson প্রথম রেলপথ থেকে 16.09 কি.মি মধ্যবর্তী ভূভাগ নির্দেশ করার জন্য এই শব্দটি প্রয়োগ করেন। এরপর whitlesey 1939 সাথে রাজনৈতিক ভূগোলে ইকুমেনের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন ইকুমেন হল এমন এক এলাকা যা পরিবহন জালিকার মাধ্যমে অন্যান্য সব এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবে। অর্থাৎ তাঁর মতে ইকুমেন কেবলমাত্র রেলপথ দিয়ে নয় বরং বিভিন্ন ধরনের পরিবহনের পথগুলি নিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
রাজনৈতিক ভূগোলের প্রাসঙ্গিক বিষয়সমূহ
(1) পরিবহন ব্যবস্থার বিকাশের দ্বারা ইকুমেনের সম্প্রসারণ হতে পারে।
(2) ইকুমেন যে কোন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিনিধি রূপে উল্লেখিত হয়।
(3) ভূ-পৃষ্ঠের মধ্যে কৃষি অঞ্চল, খনি অঞ্চল বা শিল্পাঞ্চল যে কোন স্থান ইকুমেন হতে পারে।
(4) কোন কোন রাষ্ট্রে ইকুমেনের নিজস্ব সীমানার মতো হৃদভূমি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। অন্যক্ষেত্রে এই দুটি স্বতন্ত্র এলাকারূপে নির্দেশিত হয়।
5) ভূ-রাজনীতির আঙিনায় ইকুমেনের প্রভাব থাকতে পারে।
(6) যে কোন ইকুমেনের আদর্শ অবস্থান হয় যে কোন রাষ্ট্রের কোন অঞ্চলে তবে অনেক রাষ্ট্রে প্রাপ্ত এলাকার কাছে ইকুমেন গড়ে ওঠে।
যে কোন দেশে ইকুমেনের অবস্থান অনুসারে ইকুমেন তিন ধরনের হয়ে থাকে যেমন—
(1) কেন্দ্রীয় ইকুমেন যেমন ফ্রান্সে
(2) প্রান্তীয় ইকুমেন অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলের প্রান্তিক অবস্থান।
(3) বিক্ষিপ্ত ইকুমেন:-কানাডার উদাহরণ উল্লেখযোগ্য।

0 Comments