"পশ্চিমবঙ্গ" (West Bengal)// WBBSE// WBSSC//WBSLST//WBTET// UPPER PRIMARY
WBBSE নবম শ্রেণীর ভূগোল পাঠ্যসূচির অন্তর্গত "পশ্চিমবঙ্গ" (West Bengal) অধ্যায়ের সম্পূর্ণ আলোচনা নিচে সহজ ও বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এটি তোমাকে সাহায্য করবে।
১. অবস্থান ও প্রশাসনিক বিভাগ (Location and Administration)
ভৌগোলিক অবস্থান:
অক্ষাংশগত: দক্ষিণে 21.38 উত্তর অক্ষাংশ থেকে উত্তরে 27.10 উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত।
দ্রাঘিমাংশগত: পশ্চিমে 85.50 পূর্ব দ্রাঘিমা থেকে পূর্বে 89.50 পূর্ব দ্রাঘিমা পর্যন্ত।
কর্কটক্রান্তি রেখা 23.5 degree উত্তর): এই রেখাটি পশ্চিমবঙ্গের মাঝখান দিয়ে নদিয়া (কৃষ্ণনগর), পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়া জেলার ওপর দিয়ে গেছে।
সীমানা:
আন্তর্জাতিক সীমানা: পূর্বে বাংলাদেশ (সবচেয়ে দীর্ঘ সীমানা), উত্তরে ভুটান এবং উত্তর-পশ্চিমে নেপাল।
রাজ্য সীমানা: পশ্চিমে বিহার ও ঝাড়খণ্ড, উত্তর-পূর্বে অসম এবং দক্ষিণে ওড়িশা।
প্রশাসনিক বিভাগ:
পশ্চিমবঙ্গের মোট জেলার সংখ্যা ২৩টি। রাজ্যটিকে ৫টি প্রধান প্রশাসনিক বিভাগে ভাগ করা হয়েছে:
জলপাইগুড়ি বিভাগ: দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার।
মালদা বিভাগ: উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ।
বর্ধমান বিভাগ: পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, হুগলি।
প্রেসিডেন্সি বিভাগ: কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদীয়া, হাওড়া।
মেদিনীপুর বিভাগ: পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া।
২. ভূপ্রকৃতি (Physiography / Bhuprokriti)
ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্য অনুসারে পশ্চিমবঙ্গকে প্রধানত ৩টি ভাগে ভাগ করা যায়:
ক) উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল:
তিস্তা নদী এই অঞ্চলকে দুটি ভাগে ভাগ করেছে:
তিস্তার পশ্চিম দিক: এখানে রয়েছে সিংগালীলা পর্বতশ্রেণী। এর প্রধান শৃঙ্গ সান্দাকফু (৩৬৩৬ মিটার), যা পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। এছাড়া রয়েছে ফালুট ও সবরগ্রাম।
তিস্তার পূর্ব দিক: এখানে রয়েছে দুর্বিনদাড়া পর্বত। এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ঋষিলা।
খ) পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চল:
ছোটনাগপুর মালভূমির অংশবিশেষ নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত (পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম ও মেদিনীপুরের পশ্চিমাংশ)। এটি মূলত প্রাচীন গ্রানাইট ও নিশ শিলা দ্বারা গঠিত একটি ক্ষয়প্রাপ্ত মালভূমি বা মোনাডনক। এখানকার উল্লেখযোগ্য পাহাড় হলো অযোধ্যা (সর্বোচ্চ শৃঙ্গ গোর্গাবুরু), বাঘমুণ্ডি, বিহারীনাথ ও সুশুনিয়া।
গ) সমভূমি অঞ্চল:
পার্বত্য ও মালভূমি অঞ্চল বাদে পশ্চিমবঙ্গের বাকি অংশই সমভূমি। একে আবার কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়:
তরাই ও ডুয়ার্স: উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলের পাদদেশের স্যাঁতসেঁতে অঞ্চল। তিস্তার বামদিকের অংশকে ডুয়ার্স (ভুটানের প্রবেশদ্বার) এবং ডানদিকের অংশকে তরাই বলে।
রাঢ় সমভূমি: পশ্চিমের মালভূমির পূর্বদিক থেকে ভাগীরথী-হুগলি নদীর মধ্যবর্তী তরঙ্গায়িত অঞ্চল। এখানকার মাটি লাল রঙের (ল্যাটেরাইট)।
বদ্বীপ সমভূমি (সুন্দরবন): গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের পলি জমে তৈরি পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপের দক্ষিণাংশ, যা ম্যানগ্রোভ অরণ্যে ঢাকা।
৩. নদনদী ও জলসম্পদ (Rivers and Water Resources)
উৎস এবং প্রবাহের দিক অনুসারে পশ্চিমবঙ্গের নদীগুলোকে ৪টি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
ক) উত্তরবঙ্গের নদনদী:
হিমালয়ের বরফ গলা জলে পুষ্ট হওয়ায় এই নদীগুলো নিত্যবহ (সারা বছর জল থাকে)। বর্ষাকালে এদের গতিবেগ তীব্র হওয়ায় বন্যা দেখা দেয়।
প্রধান নদী: তিস্তা (উত্তরবঙ্গের প্রধান নদী ও 'ত্রাসের নদী'), তোর্সা, জলঢাকা, মহানন্দা ও রায়ডাক।
খ) গঙ্গা ও তার শাখা নদী:
গঙ্গা নদী মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানের কাছে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে। প্রধান শাখাটি পদ্মা নামে বাংলাদেশে গেছে এবং অপর শাখাটি ভাগীরথী-হুগলি নামে পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। এটি পশ্চিমবঙ্গের প্রধান জীবনরেখা।
গ) পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চলের নদী:
ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে এই নদীগুলো পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে ভাগীরথী বা রূপনারায়ণে মিশেছে। এগুলো বৃষ্টি-পুষ্ট নদী, তাই গ্রীষ্মকালে জল থাকে না বললেই চলে, কিন্তু বর্ষায় হঠাৎ বন্যা সৃষ্টি করে।
প্রধান নদী: দামোদর ('বাংলার দুঃখ' বলা হতো), রূপনারায়ণ, কংসাবতী, ময়ূরাক্ষী, অজয় ও সুবর্ণরেখা।
ঘ) সুন্দরবন অঞ্চলের নদী:
জোয়ারের জলে পুষ্ট হওয়ায় এই নদীগুলোর জল লবণাক্ত।
প্রধান নদী: মাতলা, গোসাবা, বিদ্যাধরী, পিয়ালী ও সপ্তমুখী।
৪. জলবায়ু (Climate)
পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ু প্রধানত উষ্ণ-আর্দ্র ক্রান্তীয় মৌসুমি প্রকৃতির। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আগমন এবং উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাবর্তনের ওপর ভিত্তি করে ঋতু পরিবর্তন ঘটে।
প্রধান চার ঋতু:
গ্রীষ্মকাল (মার্চ - মে): তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় (মালভূমি অঞ্চলে ৪০°C ছাড়িয়ে যায়)। এই সময়ে বিকেলে যে তীব্র ঝড়-বৃষ্টি হয়, তাকে কালবৈশাখী বলে।
বর্ষাকাল (জুন - সেপ্টেম্বর): জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে রাজ্যে বর্ষাকাল শুরু হয়। আলিপুরদুয়ারের বক্সা দুয়ারে রাজ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় এবং ময়ূরেশ্বরে (বীরভূম) সবচেয়ে কম বৃষ্টি হয়।
শরৎকাল (অক্টোবর - নভেম্বর): মৌসুমি বায়ু ফিরে যাওয়ার সময় আকাশে মেঘ থাকে না। এই সময়ে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে যে ঘূর্ণিঝড় হয়, তাকে আশ্বিনের ঝড় বলে।
শীতকাল (ডিসেম্বর - ফেব্রুয়ারি): শুষ্ক ও শীতল উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে শীতকাল মনোরম হয়। পার্বত্য অঞ্চলে তুষারপাত ঘটে।
৫. মৃত্তিকা বা মাটি (Soil)
গঠন ও উপাদান অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের মাটিকে ৫টি ভাগে ভাগ করা যায়:
| মাটির প্রকারভেদ | অবস্থান ও এলাকা | বৈশিষ্ট্য |
| ১. পার্বত্য মাটি (Podzol) | দার্জিলিং, কালিম্পং ও জলপাইগুড়ির পার্বত্য অঞ্চল। | হিউমাস সমৃদ্ধ, অম্লধর্মী এবং চা ও কমলালেবু চাষের জন্য উপযোগী। |
| ২. তরাই মৃত্তিকা | হিমালয়ের পাদদেশীয় তরাই অঞ্চল। | পলি ও বালির ভাগ বেশি থাকে, মূলত ধান ও পাট চাষ হয়। |
| ৩. পলি মাটি (Aluvial) | উত্তর ও দক্ষিণ সমভূমি, গাঙ্গেয় অঞ্চল। | পশ্চিমবঙ্গের সিংহভাগ এলাকা জুড়ে রয়েছে। এটি অত্যন্ত উর্বর। পুরনো পলিকে ভাঙর এবং নতুন পলিকে খাদার বলে। |
| ৪. ল্যাটেরাইট ও লাল মাটি | পশ্চিমের মালভূমি ও রাঢ় অঞ্চল। | লোহা ও অ্যালুমিনিয়ামের আধিক্যের জন্য রঙ লাল। জলধারণ ক্ষমতা কম, তাই অনুর্বর। মোটা দানাশস্য (মিলেট) চাষ হয়। |
| ৫. লবণাক্ত ও উপকূলীয় মাটি | সুন্দরবন ও দীঘা উপকূল অঞ্চল। | লবণের পরিমাণ বেশি এবং ক্ষারধর্মী। নারকেল ও তরমুজ ভালো চাষ হয়। |
৬. স্বাভাবিক উদ্ভিদ (Natural Vegetation)
জলবায়ু ও মাটির ওপর নির্ভর করে পশ্চিমবঙ্গে ৫ ধরনের অরণ্য দেখা যায়:
ক) ক্রান্তীয় চিরহরিৎ অরণ্য: উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স অঞ্চলের যেখানে বৃষ্টিপাত ২৫০ সেমির বেশি, সেখানে এই অরণ্য দেখা যায়। (যেমন- শিশু, শাল, গর্জন)।
খ) ক্রান্তীয় পর্ণমোচী বা পর্ণঝোপ অরণ্য: এটি পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বেশি এলাকা জুড়ে রয়েছে (রাঢ় ও মালভূমি অঞ্চল)। শীতকালে এই গাছের পাতা ঝরে যায়। (যেমন- শাল, পলাশ, মহুয়া, শিমুল)।
গ) পার্বত্য নাতিশীতোষ্ণ অরণ্য: উত্তরের ১০০০-৩০০০ মিটার উচ্চতায় দেখা যায়। (যেমন- ওক, ম্যাপল, রডোডেনড্রন, পাইন, ফার)।
ঘ) ম্যানগ্রোভ বা লবণাম্বু উদ্ভিদ: সুন্দরবনের জোয়ার-ভাটার লবণাক্ত মাটিতে এই উদ্ভিদ জন্মায়। মাটিতে অক্সিজেনের অভাব পূরণের জন্য এদের শ্বাসমূল (Pneumatophore) এবং গাছকে সোজা করে ধরে রাখার জন্য ঠেসমূল থাকে। (যেমন- সুন্দরী, গরান, গেঁউয়া, গোলপাতা)।

0 Comments