Ad Code

Ticker

7/recent/ticker-posts

মৃত্তিকা সৃষ্টির নিয়ন্ত্রক গুলি আলোচনা করো// factors affecting the formation of the SOIL

 মৃত্তিকা সৃষ্টির নিয়ন্ত্রক গুলি আলোচনা করো// factors affecting the formation of the SOIL

দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশে ভৌত, রাসায়নিক, জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদি শিলার পরিবর্তনের ফলে ভূপৃষ্টের সমান্তরালে বিভিন্ন খনিজ ও জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ যে পাতলা ভঙ্গুর আবরনী স্তর সৃষ্টি হয়, যা উদ্ভিদ বৃদ্ধির সহায়ক, তাকে মৃত্তিকা বলে।


মৃত্তিকা বিজ্ঞানী জেনির মতে মৃত্তিকা সৃষ্টির পাঁচ টি নিয়ন্ত্রক আছে।মৃত্তিকা সৃষ্টি প্রসঙ্গে জেনি প্রদত্ত সমীকরনটি হল – S = f (Cl, O, R, P,T) যেখানে S = মৃত্তিকা, f = কার্যকারন, Cl = জলবায়ু, O = জীবজগত, R = ভূ-প্রকৃতি, P = আদিশিলা, T = সময় ।

সক্রিয় কারণ  - জলবায়ু ও জীব জগত এই দুই   হল মৃত্তিকা সৃষ্টির সক্রিয় কারণ। এর ফলে  মৃত্তিকা গঠনের জন্য শক্তি জোগায় ও রেগোলিথকে সক্রিয় ভাবে পরিবর্তন করে।

১. জলবায়ুর প্রভাব – মৃত্তিকা সৃষ্টির অন্যতম  গুরুত্বপূর্ণ  কারণ হল জলবায়ু। জলবায়ুর প্রভাবে গঠিত মাটি সমূহ এক্টোডায়নামোমরফিট মাটি নামে পরিচিত। বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা জলবায়ুর এই দুটি উপাদান প্রত্যক্ষ ভাবে মৃত্তিকা সৃষ্টিতে অংশ গ্রহন করে।

বৃষ্টিপাতের ভূমিকা

➤  যেসব অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমান বেশি সেখানে আবহবিকার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়।যেমন আর্দ্র জলবায়ু অঞ্চলে, এই কারণে আর্দ্র অঞ্চলের মাটিতে কাদার পরিমান বেশি থাকে। যেমন – এটেল মাটি

➤ বৃষ্টিপাত অধিক হলে মৃত্তিকায় হাইড্রোজেন আয়নের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ফলে pH এর পরিমাণ কমে, মৃত্তিকা আম্লিক হয়।

➤ বৃষ্টিপাতের পরিমান বেশি হলে মাটিতে উদ্ভিদের  আবরন ঘন হয় ও মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমান বাড়ে।

➤ অতি বৃষ্টিপাত যুক্ত অঞ্চলে মৃত্তিকার স্তর গুলি পুরু হওয়ার ফলে গভীর মাটির সৃষ্টি হয়। সাধারণত বৃষ্টিপাতের পরিমান যত কমে মৃত্তিকা তত অগভীর হয়।

➤ মরু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অল্প হওয়ায় আবহবিকারের মাধ্যমে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম প্রভৃতি খনিজ গুলি মৃত্তিকার ঊর্দ্ধস্তর থেকে অপসিত হয় হয় না ফলে মৃত্তিকা ক্ষারকীয় প্রকৃতির হয়।

➤ বাষ্পীভবন অপেক্ষা বৃষ্টিপাত কম হলে কৈশিক প্রক্রিয়ায় মৃত্তিকার নিচ থেকে উপরের দিকে ক্যালসিয়াম কার্বনেট ও লবন উঠে আসে ও মাটির ওপরের স্তরে সঞ্চিত হয়।

তাপমাত্রার ভূমিকা


➤ তাপমাত্রা বাড়লে আবহবিকারের কার্যকারিতা বাড়ে। ফলে পুরু রেগোলিথের উৎপত্তি হয় এবং মাটির গভীরতা বাড়ে।
➤  প্রতি ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে রাসায়নিক প্রক্রিয়ার হার দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। তাই শীতল মরু অঞ্চলের তুলনায় উষ্ণ ক্রান্তীয় ও নিরক্ষীয় অঞ্চলে মৃত্তিকা সৃষ্টির হার দ্রুত।

➤ অধিক উষ্ণ অঞ্চলের মাটি তে জৈব পদার্থের পরিমান কম হয় এবং নাইট্রোজেনের পরিমান হ্রাস পায়।

➤ তাপমাত্রা বেশি হলে মাটিতে কাদা জাতীয় খনিজ যেমন – মন্টমোরিলোনাইট, কেওলিনাইট ইত্যাদির পরিমান বেশি হয়।

➤ অধিক তাপমাত্রার জন্য মরু ও মরু প্রায় অঞ্চলের মাটি শুষ্ক ও লবনাক্ত হয়।

জীব জগতের প্রভাব – উদ্ভিদ ও প্রানী জগতের প্রত্যক্ষ প্রভাবে মৃত্তিকার সৃষ্টি হয় যেমন –

➤প্রানী ও উদ্ভিদের মৃত দেহাবশেষ বিয়োজিত হয়ে মাটিতে হিউমাস রূপে সংযোজিত হয়, ফলে মাটির পুষ্টি গুন বাড়ে ও মাটি উর্বর হয়।

➤মাটিতে হিউমাসের পরিমান বাড়লে মাটির জলধারণ ক্ষমতা বাড়ে।

➤উদ্ভিদের শিকড় শিলায় প্রবেশ করে জল ও বাতাসের চলাচলের পথ সৃষ্টি করে দেয়।

➤মাটির গর্তে বসবাস কারী প্রানীরা যেমন কেঁচো, খরগোশ, পিঁপড়ে, ইঁদুর ইত্যাদি মাটির ওপর ও নিচের স্তরের মধ্যে মিশ্রন ঘটায় ফলে বায়ু চলাচল করা সহজ হয় এবং মৃত্তিকা আলগা হয়।

➤কেঁচোর মল নাইট্রোজেন ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ হওয়ার ফলে কেচোর উপস্থিতি মাটি কে উর্বর করে।

নিস্ক্রিয় বা পরোক্ষ কারণ 


যে সমস্ত কারণ গুলি জলবায়ু ও জীব জগতের মতো অতটা সক্রিয় নয়, তবে মৃত্তিয়াক সৃষ্টির তে পরোক্ষ ভাবে অংশ গ্রহন করে, তাদের কে নিস্ক্রিয় কারণ বলে। যেমন – ভূ-প্রকৃতি, আদিশিলা ও সময়।

 জনক বা আদি শিলা (Parent Materials or Rock) : মৃত্তিকা বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। মৃত্তিকাদেহ (Soil body) গঠন করতে যে পদার্থ সবচেয়ে বেশি পরিমাণে লাগে, তার উৎসকে মূল উপাদান বলে। নিরেট শিলা (Solid rock) কিংবা বিয়োজিত শিলা সাধারণত মাটি গঠনের প্রধান উৎস হওয়ায় একে জনক বা আদি শিলাও বলে।
            খনিজ, জৈব ও অজৈব পদার্থের মিশ্রণেই গড়ে ওঠে মাটির মূল উপাদান। তবে মূল উপকরণ হিসাবে খনিজের প্রাধান্যই বেশি থাকে। সাধারণত (1) গ্রানাইট, নিস ইত্যাদি—–আম্লিক শিলারূপে, (2) অ্যান্ডেসাইট, ডাইওরাইট—মধ্যবর্তী শিলারূপে, (3) ব্যাসল্ট, ডোলেরাইট - ক্ষারকীয় শিলারূপে, (4) পেরিডোটাইট, সারপেনটাইন— অতি ক্ষারকীয় শিলারূপে এবং (5) চুনাপাথর, মার্বেল— কার্বনেট শিলারূপে মাটি গঠনে আদি শিলার ভূমিকা পালন করে। এছাড়া মৃত্তিকা গঠনে সঞ্চিত পলিও মূল উপাদান রূপে কাজ করে। আদিশিলা মাটি গঠনে যে প্রভাব ফেলে তা হল - 

 

১। মাটির ধর্ম : মৃত্তিকার মূল উপাদান দ্বারা মুক্তিকার ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম, যথা- এখন, কাঠামো, জলবারণ ক্ষমতা, বর্ণ, ph এর মান প্রভৃতি নিয়ন্ত্রিত হয়। এজন্য বিভিন্ন শিলায় বিভিন্ন ধরনের মাটি গঠিত হতে দেখা যায়। যেমন—–(1) গ্রানাইট ও নিস্ শিলায় । ফেসপারের পরিমাণ বেশি থাকলে কাদামাটি সৃষ্টি হয়। () ব্যাসন্ট শিলা থেকে কৃষ্ণমৃত্তিকা, ল্যাটেরাইট ও লাল মুক্তিকা সৃষ্টি হয়। (১) চুনাপাথর ও মার্বেল থেকে রেনজিনা মাটি এবং সিলিকা-সমৃদ্ধ শিক্ষা থেকে পড়সল মাটি গড়ে ওঠে।  



। শিলার সক্রিয়তা: আদি শিলার প্রভাব সর্বাধিক হলে এন্ডোডায়ানামোমরফিক মাটির উৎপত্তি হয়। যেমন লিখোসল, রেগোসল ও অ্যালুভিয়াম।


৩। মাটির রং : খনিজ লবণ, চুনাপাথর ও কোয়ার্টর সমৃদ্ধ মাটির রং সাদা, ধূসর ও কখনো কখনো অলিভ সবুজ হয়। ● মাটির কাঠামো : আদি শিলার খনিজ ফেল্ডপার হলে কালামাটির সৃষ্টি হয়। কাদামাটি বেশি হলে তা মাটির বিভিন্ন ধরনের কাঠামো সাহায্য করে।


৪। মাটির ক্ষারকীয়তা: আমি শিলা পেরিডোটাইট ও সারপেনটাইন হলে মাটি স্কারধর্মী হয়।


 ৫। মাটির গঠন : আদি শিলায় চুনের পরিমাণ বেশি থাকলে মাটি শুরু গঠনের হয়। আর সোডিয়াম যৌগ বেশি থাকলে কথাগুলি বিচ্ছিন্ন হয়, গঠন পূর্বল হয় ও মাটি অনুর্বর হয়। 


ভূপ্রকৃতি (Topography or Relief) : ভূপ্রকৃতি মৃত্তিকার মধ্যে মূলত আর্দ্রতা ও জলের চলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে জলনিকাশি ব্যবস্থা বাতি অথবা বাধাপ্রাপ্ত উভয়ই হতে পারে। ভৌমজলপ্তরের উত্তল অথবা অবতল অবস্থা ভূপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। উল্লিখিত সব অবস্থাই মুস্তিকা গঠন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। যেমন - 
১। পার্বত্য ভূ-প্রকৃতিতে মাটি গঠনে জনক শিলার প্রভাব বেশি। ভূমির ঢাল বেশি হওয়ায় চূর্ণীকৃত পদার্থ সহজেই অপসারিত হয় বলে মৃত্তিকার স্বর গঠন প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে, মুক্তিকা অপরিণত বা নবীন অবস্থায় থাকে। এই ধরনের নবীন মৃত্তিকার সঙ্গে বড়ো বড়ো পাথর, শিলাখণ্ড, বোল্ডার ইত্যাদি মিশে যে মুক্তিকার সৃষ্টি হয় তাকে কঙ্কালসার (Skeletal) মুক্তিকা বলে।


২। পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন উচ্চতায় বিভিন্ন ধরনের জলবায়ু বিরাজ করায় নানা ধরনের মুক্তিকা গঠিত হয়।


৩। উত্তর গোলার্ধে পর্বতের দক্ষিণমুখী ঢাল অধিকতর উচু, আলোকিত ও আর্দ্র থাকে। এখানে ক্ষারধর্মী চুনময় মাটি সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ গোলার্ধে এর বিপরীত অবস্থা লক্ষ করা যায় এবং আগ্নিক মাটির সৃষ্টি হয়।  



৪। ভূমির ঢাল অবতল হলে, মৃত্তিকা সঞ্চয়ের উপযোগী পরিবেশ গড়ে ওঠে। আবার ওই ঢাল উত্তল হলে ক্ষয়কার্যের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ভূমির একই ঢালে উত্তল ও অবতল অংশে ভিন্ন প্রকৃতির মৃত্তিকা গড়ে ওঠে। একই ঢালের ঊর্ধ্বাংশে মৃত্তিকার ক্ষয় বেশি ও জৈব পদার্থের সঞ্চয় কম হয়। কিন্তু নিম্নাংশে মৃত্তিকার গভীরতা ও জৈব পদার্থের সঞ্চয় বেশি হয়।


৫। খাড়া ঢালযুক্ত ভূমিভাগে ক্ষয়কার্য বেশি এবং অনুস্রাবণ অপেক্ষা পৃষ্ঠপ্রবাহ বেশি হওয়ায় ভূমিভাগ উদ্ভিদহীন হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে মৃত্তিকা অগভীর হয় এবং বোল্ডার, নুড়ি, পাথর, কাঁকর, বালি ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ থাকে। 



ভূমির বয়স বা সময় (Age of Soil) : রেগোলিথ থেকে পরিণত মাটি সৃষ্টি হতে যে সময়ের প্রয়োজন হয় তাকে মাটি সৃষ্টির সময় বলে। মাটি গঠনে সময়ের ভূমিকা সঠিকভাবে নির্ণয় করা মুশকিল হলেও দেখা গেছে যে - 
১। অপ্রবেশ্য পদার্থ অপেক্ষা বেলেপাথরের ন্যায় প্রবেশ্য পদার্থে মুক্তিকা গঠন দ্রুতগতিতে সংঘটিত হয়। হিমবাহ সঞ্চয়ের (Tills) উপর মৃত্তিকা গঠিত হতে কয়েকশো বছর লেগে যায় এবং ভারী ব্যাসস্টের উপর মুক্তিকার গঠন হতে আরও অনেক বেশি সময় লাগে।



২। মূল উপকরণ থেকে মৃত্তিকা সৃষ্টি হতে দীর্ঘ সময় লাগে।2-2.5 সেমি মৃত্তিকা সৃষ্টি হতে কয়েকশো বছর লেগে যায়। মৃত্তিকা গঠনের জন্য যে দীর্ঘ সময় লাগে, তা নির্ভর করে আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান, ভূমিরূপ (Landform),আণুবীক্ষণিক জীব প্রভৃতি কতকগুলি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিষয়ের ওপর।


৩। অপরিণত মৃত্তিকাতে মূল উপাদানের চরিত্র প্রকট হয়। অপরিণত মৃত্তিকাতে স্তরায়ণ সুস্পষ্ট নয়।


৪। মাটি দীর্ঘ সময় ধরে গঠিত হলে তা পরিণত অবস্থায় আসে। অনুকূল পরিবেশে মৃত্তিকা পরিণত অবস্থায় পৌঁছাতে সময় লাগে কয়েকশো বছর। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশে মৃত্তিকার পরিণত অবস্থায় পৌঁছাতে সময় লাগে কয়েক হাজার বছর। পরিণত মৃত্তিকাতে স্তর সুস্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়।


৫। কালক্রমে নবীন মৃত্তিকা পরিণত মৃত্তিকাতে রূপান্তরিত হয় এবং পরিণত মৃত্তিকা ক্ষয়ের কবলে পড়ে।


Reactions

Post a Comment

0 Comments

Ad Code