Ad Code

Ticker

7/recent/ticker-posts

WBBSE//CLASS 9 // আবহবিকার// WEATHERING

 WBBSE//CLASS 9 // আবহবিকার// WEATHERING 






পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর ভূগোলের পঞ্চম অধ্যায়ের "আবহবিকার, মাটি গঠন প্রক্রিয়া, মৃত্তিকা ক্ষয় ও সংরক্ষণ" অংশের একটি সম্পূর্ণ এবং বিস্তারিত নোট নিচে দেওয়া হলো। 

১. আবহবিকার (Weathering): উপাদান ও শ্রেণীবিভাগ

আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান (উষ্ণতা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা প্রভৃতি) এবং জীবজগতের প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের শিলাস্তর যখন যান্ত্রিকভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ বা রাসায়নিকভাবে বিয়োজিত হয়ে স্বস্থানে বা নিজের জায়গায় পড়ে থাকে, তখন তাকে আবহবিকার বলে।

আবহবিকারের মূল উপাদানসমূহ (Components/Agents)

  • জলবায়ুর উপাদান: সূর্যতাপ, বৃষ্টিপাত, বায়ুর আর্দ্রতা, তুষার।

  • গ্যাসীয় উপাদান: অক্সিজেন ($O_2$), কার্বন ডাই-অক্সাইড ($CO_2$), জলীয় বাষ্প ($H_2O$)।

  • জৈবিক উপাদান: উদ্ভিদের শিকড়, কেঁচো, ইঁদুর, মানুষ ইত্যাদি।



আবহবিকারের বিস্তারিত শ্রেণীবিভাগ (Types of Weathering)

আবহবিকারকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:

                  ┌───────────────────┴───────────────────┐
         যান্ত্রিক আবহবিকার      রাসায়নিক আবহবিকার       জৈবিক আবহবিকার

ক) যান্ত্রিক আবহবিকার (Mechanical Weathering)

উষ্ণতা, আর্দ্রতা বা চাপের পরিবর্তনের ফলে রাসায়নিক পরিবর্তন ছাড়াই শিলা যখন কেবল যান্ত্রিকভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়, তাকে যান্ত্রিক আবহবিকার বলে। এটি প্রধানত শুষ্ক মরু অঞ্চল এবং শীতল পার্বত্য অঞ্চলে বেশি দেখা যায়।

  • ১. প্রস্থরচাই খণ্ডীকরণ (Block Disintegration): সমসত্ত্ব শিলা দিয়ে গঠিত অঞ্চলে দিনের বেলা তীব্র তাপে শিলা প্রসারিত হয় এবং রাতে সংকুচিত হয়। বারবার এই ঘটনা ঘটায় শিলার সমান্তরাল ফাটল বরাবর শিলাখণ্ডগুলি চৌকো বা আয়তাকার ব্লকের মতো খণ্ড খণ্ড হয়ে ভেঙে পড়ে।

  • ২. শল্কমোচন (Exfoliation): গ্রানাইট জাতীয় শিলার ওপরের অংশ দিনের বেলা বেশি উত্তপ্ত হলেও ভেতরের অংশ কম গরম হয়। ফলে শিলার বাইরের স্তর পেঁয়াজের খোসার মতো আলগা হয়ে খুলে আসে। একে শল্কমোচন বলে।

  • ৩. ক্ষুদ্রকণা বিশরণ (Granular Disintegration): বিষমসত্ত্ব শিলা (ভিন্ন ভিন্ন খনিজ দ্বারা গঠিত) তীব্র সূর্যতাপে ভিন্ন ভিন্ন হারে প্রসারিত ও সংকুচিত হয়। এর ফলে শিলার মধ্যে তীব্র টানের সৃষ্টি হয় এবং শিলাটি একদিন হঠাৎ 'পট পট' শব্দ করে ছোট ছোট কণার আকারে ভেঙে যায়।

  • ৪. তুষারের কাজ বা তুষার খণ্ডীকরণ (Frost Wedging): উচ্চ পার্বত্য ও শীতল অঞ্চলে শিলার ফাটলের মধ্যে জল জমে বরফে পরিণত হলে তার আয়তন $9\%$ বেড়ে যায়। এই বরফ ফাটলের দেওয়ালে প্রচণ্ড চাপ দেয়, ফলে শিলাটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় (যাকে স্ক্রী বা ট্যালুস বলে)।

খ) রাসায়নিক আবহবিকার (Chemical Weathering)

বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, জলীয় বাষ্প ও বিভিন্ন অম্লের সংস্পর্শে এসে শিলার মধ্যস্থিত খনিজগুলির যখন রাসায়নিক পরিবর্তন বা বিয়োজন ঘটে, তখন তাকে রাসায়নিক আবহবিকার বলে। এটি আর্দ্র ক্রান্তীয় বা নিরক্ষীয় অঞ্চলে বেশি দেখা যায়।

  • ১. জারণ বা অক্সিডেশন (Oxidation): শিলার খনিজের সাথে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতিতে অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়াকে জারণ বলে। এর ফলে লোহার ওপর মরিচা পড়ে এবং শিলা সহজে ভেঙে যায়।

    $$4Fe_3O_4 (ম্যাগনেটাইট) + O_2 \rightarrow 6Fe_2O_3 (হেমাটাইট/মরিচা)$$
  • ২. অঙ্গারযোজন বা কার্বনেশন (Carbonation): বৃষ্টির জলের সাথে কার্বন ডাই-অক্সাইড মিশে মৃদু কার্বনিক অ্যাসিড ($H_2CO_3$) তৈরি করে। এই অ্যাসিড চুনাপাথরের ওপর বিক্রিয়া করে তাকে সহজে দ্রবীভূত করে ক্যালশিয়াম বাইকার্বনেটে পরিণত করে। চুনাপাথর যুক্ত অঞ্চলে বা কাimport গুহায় এটি প্রধান ভূমিকা নেয়।

    $$CaCO_3 + H_2CO_3 \rightarrow Ca(HCO_3)_2$$
  • ৩. জলযোজন বা হাইড্রেশন (Hydration): শিলার ভেতরের খনিজগুলির সাথে জল যুক্ত হলে খনিজের আয়তন বৃদ্ধি পায় এবং শিলা দুর্বল হয়ে পড়ে। যেমন: হেমাটাইট জলের সাথে যুক্ত হয়ে লিমোনাইটে পরিণত হয়।

  • ৪. আর্দ্র বিশ্লেষণ বা হাইড্রোলাইসিস (Hydrolysis): এখানে জল হাইড্রোজেন ($H^+$) এবং হাইড্রোক্সিল ($OH^-$) আয়নে ভেঙে গিয়ে শিলার খনিজের সাথে সরাসরি রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়। যেমন—ফেল্ডসপার খনিজটি কওলিনে (এক ধরণের কাদা) পরিণত হয়।

গ) জৈবিক আবহবিকার (Biological Weathering)

উদ্ভিদ এবং প্রাণীদের দ্বারা শিলার যে যান্ত্রিক চূর্ণীকরণ বা রাসায়নিক বিয়োজন ঘটে, তাকে জৈবিক আবহবিকার বলে।

  • যান্ত্রিক প্রভাব: উদ্ভিদের শিকড় শিলার ফাটলে প্রবেশ করে বড় হলে ফাটল চওড়া হয়ে শিলা ভেঙে যায়। এছাড়া কেঁচো, ইঁদুর, প্রেইরি কুকুর মাটিতে গর্ত খুঁড়ে শিলাকে আলগা করে দেয়।

  • রাসায়নিক প্রভাব: উদ্ভিদের পচা পাতা বা শ্যাওলা থেকে নির্গত জৈব অম্ল (Humic Acid) এবং প্রাণীদের মূত্র বা বর্জ্য পদার্থ শিলার খনিজকে গলিয়ে দিতে সাহায্য করে।

২. মাটি গঠন প্রক্রিয়া (Soil Formation Process)

আবহবিকারের ফলে ভূপৃষ্ঠের শক্ত শিলা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যে শিথিল ও নরম ভূ-আস্তরণ তৈরি করে, তাকে রেগোলিথ (Regolith) বলে। এই রেগোলিথের সাথেই জৈব পদার্থ ও জল মিশে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাটি তৈরি হয়। মাটি গঠনের প্রক্রিয়াকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

মৌলিক প্রক্রিয়া (Fundamental Processes)

  1. হিউমিফিকেশন (Humification): মাটিতে উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃতদেহ ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক দ্বারা পচে গিয়ে কালো বা গাঢ় বাদামী রঙের আঠালো 'হিউমাস' তৈরি করার প্রক্রিয়াকে হিউমিফিকেশন বলে। হিউমাস মাটির উর্বরতা বাড়ায়।

  2. অ্যালুভিয়েশন (Eluviatoni): মাটির ওপরের স্তর (A স্তর) থেকে খনিজ পদার্থ ও লোহা-অ্যালুমিনিয়াম কণা জলের সাথে ধুয়ে নিচের স্তরে নেমে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে অ্যালুভিয়েশন বলে।

  3. ইলুভিয়েশন (Illuviatoni): ওপরের স্তর থেকে ধুয়ে আসা খনিজ ও কোলয়েড কণাগুলি যখন মাটির নিচের স্তরে (B স্তর) এসে সঞ্চিত ও জমা হয়, তখন তাকে ইলুভিয়েশন বলে।

বিশেষ প্রক্রিয়া (Specific Processes)

  • পডজলাইজেশন: শীতল ও আর্দ্র সরলবর্গীয় বনভূমি অঞ্চলে আম্লিক হিউমাসের প্রভাবে এই প্রক্রিয়ায় ধূসর রঙের 'পডজল' মাটি তৈরি হয়।

  • ল্যাটেরিটাইজেশন: ক্রান্তীয় অঞ্চলের তীব্র উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুতে মাটির ওপরের স্তর থেকে সিলিকা ধুয়ে নিচে চলে যায় এবং লোহা ও অ্যালুমিনিয়াম ওপরে পড়ে থেকে লাল রঙের শক্ত 'ল্যাটেরাইট' মাটি তৈরি করে।

৩. মৃত্তিকা ক্ষয় (Soil Erosion): কারণ

প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট কারণে মাটির ওপরের উর্বর স্তর আলগা হয়ে একস্থান থেকে অন্যস্থানে অপসারিত হওয়াকে মৃত্তিকা ক্ষয় বলে।

প্রাকৃতিক কারণ:

  • ১. বৃষ্টির ফোটার আঘাত (Raindrop Erosion): তীব্র গতিতে বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়লে মাটির কণা আলগা হয়ে ছিটকে যায়।

  • ২. শিট ক্ষয় বা চাদর ক্ষয় (Sheet Erosion): তীব্র বৃষ্টির জল যখন কোনো বিস্তীর্ণ ঢালু অঞ্চলের ওপর দিয়ে চাদরের মতো বয়ে যায়, তখন মাটির ওপরের পুরো পাতলা স্তরটি ধুয়ে যায়।

  • ৩. রিল ক্ষয় (Rill Erosion): ঢালু জমিতে বৃষ্টির জল ছোট ছোট সরু নালীর মতো তৈরি করে মাটি ধুয়ে নিয়ে যায়।

  • ৪. গালি ক্ষয় (Gully Erosion): রিল ক্ষয়ের নালীগুলি যখন সময়ের সাথে সাথে আরও চওড়া ও গভীর হয়ে বড় বড় খাদের সৃষ্টি করে, তাকে গালি ক্ষয় বলে। (যেমন: শান্তিনিকেতনের খোয়াই অঞ্চল)।

মনুষ্যসৃষ্ট কারণ:

  • অসংযত বৃক্ষছেদন: গাছ কাটার ফলে গাছের শিকড় আর মাটিকে ধরে রাখতে পারে না, ফলে মাটি সহজে ধুয়ে যায়।

  • অৈজ্ঞানিক চাষাবাদ: পাহাড়ের ঢালে ধাপ না কেটে লম্বালম্বি চাষ করলে জল দ্রুত নেমে মাটি ক্ষয় করে।

  • অতিরিক্ত পশুচারণ: পশুর খুরের আঘাতে মাটির উপরিভাগ আলগা ও চূর্ণ হয়ে যায়।

৪. মৃত্তিকা সংরক্ষণ (Soil Conservation): উপায় বা পদ্ধতি

ভবিষ্যতের জন্য মাটির উর্বরতা বজায় রেখে মাটিকে ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করার পদ্ধতিকে মৃত্তিকা সংরক্ষণ বলে। এর প্রধান উপায়গুলি হলো:

  • ১. বৃক্ষরোপণ ও সামাজিক বনসৃজন: গাছপালা লাগানো মৃত্তিকা সংরক্ষণের সবচেয়ে সেরা উপায়। গাছের শিকড় মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে এবং পাতার ছাউনি বৃষ্টির ফোঁটার আঘাত সরাসরি মাটিতে পড়তে দেয় না।

  • ২. ধাপ চাষ (Terrace Farming): পার্বত্য অঞ্চলের ঢালু জমিতে সিঁড়ির মতো ধাপ কেটে চাষ করলে জলের গতি কমে যায় এবং মাটি ক্ষয় হ্রাস পায়।

  • ৩. ফালি চাষ (Strip Cropping): পাহাড়ের ঢালে আড়াআড়িভাবে চওড়া ফালির মতো জমি তৈরি করে শস্য চাষ করলে মাটির ক্ষয় রোধ হয়।

  • ৪. সমোন্নতি রেখা বরাবর চাষ (Contour Ploughing): পাহাড়ের সমউচ্চতা যুক্ত রেখা বরাবর লাঙল দিয়ে বাঁধের মতো তৈরি করে চাষ করলে বৃষ্টির জল সহজে মাটি ধুয়ে নিয়ে যেতে পারে না।

  • ৫. মালচিং (Mulching): গাছের গোড়ায় বা ফাঁকা মাটিতে খড়, শুকনো পাতা বা প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, যাতে মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং বৃষ্টির জল সরাসরি মাটিকে আঘাত করতে না পারে।

  • ৬. পশুচারণ নিয়ন্ত্রণ: নির্দিষ্ট চারণভূমিতে পশুদের চড়ানো উচিত, যাতে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মাটি আলগা না হতে পারে।





Reactions

Post a Comment

0 Comments

Ad Code